সিনেমার কষ্টের গল্প বাস্তব জীবনেই ঘটে গেল অভিনেত্রীর সঙ্গে

রুপালি পর্দায় মায়ের দুঃখ-ক’ষ্ট দেখে কাতর হননি এমন মানুষ কমই আছেন। সিনেমা’র গল্পে যে মায়ের আকুতি বাস্তব জীবনকেও হার মানিয়েছে।বলছি,

বড় পর্দার অ’তি পরিচিত মা চরিত্র রূপায়নকারী রেহানা জলির কথা। কিন্তু বিধিবাম! বাস্তব জীবনেও অ’ভিনেত্রী জলি মানবেতর জীবন যাপন করছেন। যা এখন সিনেমা’র গল্পকে হার মানায়।

২০১৮ সালে রেহানা জলির ফুসফুসে প্রদাহ ধ’রা পড়ে। এরপর মেরুদ’ণ্ডের হাড়ের সমস্যার কথা জানান চিকিৎসক। মেরুদ’ণ্ডের হাড়ের সমস্যার পরপরই চিকিৎসক রেহানা জলিকে পুরোপুরি বিশ্রামে থাকার পরাম’র্শ দেন। কিন্তু এরপরই তার ফুসফুসে ক্যানসারের জীবাণু পাওয়া যায়। শুরুর দিকে ফুসফুস ও হাড়ের চিকিৎসায় মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা খরচ হতো। এই টাকার যোগান দিতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। অভাব-অনটনের মধ্যে তাকে দেখভাল করার মতো স্বামী-সংসার বলতে কেউ-ই নেই। তাই বাধ্য হয়ে বোন লাইজুর সঙ্গে ইস্কাটনের গাউসনগর এলাকায় রয়েছেন রেহানা জলি।

তিন দশকেরও বেশি সময় যেসব সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের নীরবতায় ক’ষ্ট পেয়েছেন রেহানা জলি।

এ অ’ভিনেত্রী বলেন, ‘আমাকে দেখার কেউ নেই। আমা’র বোনটা ছিল বলে এখনো বেঁচে আছি। দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করতে পারছি না। দেখা হয় না পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে। অ’সুস্থতার কারণে পারছি না। এতদিন কেমন ছিলাম? কি করছি? খেয়ে আছি নাকি না খেয়ে আছি তার খবর কেউ নেয় না। আমা’র পুরো জীবনটাই কে’টেছে অ’ভিনয়ে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুটিং করেছি। দেশের নামকরা সব নায়ক–নায়িকার মায়ের ভূমিকায় অ’ভিনয় করেছি। অথচ গত এক বছরে কেউ একটাবারের জন্যও আমা’র খোঁজ নিলো না। কেউ একজন তো ফোন করে অন্তত জিজ্ঞেস করতে পারত, জলি আপা, কেমন আছেন! অ’সুস্থ হয়ে মানুষ চিনতে পারছি।’

কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভা’রী হয়ে যায় এই অ’ভিনেত্রীর। এদিকে করো’না নিয়েও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তিনি। জলি বলেন, ‘করো’নার কারণে আরো দুর্ভোগে পড়েছি। কি করবো, না করবো বুঝে উঠতে পারছি না। কেউ খোঁজ নেয় না। সাহায্যের জন্যও এগিয়ে আসে না।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে অনুদান পেয়েছিলেন জলি। তা দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। এ অ’তীত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এ অ’ভিনেত্রী।

গেন্ডারিয়ার মনিজা রহমান গার্লস স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়াকালীন, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে টুকটাক কাজ করতেন জলি। হঠাৎ একজনের মাধ্যমে সিনেমায় অ’ভিনয়ের ডাক পান। পরিবারের কিছুটা অমত থাকলেও শেষমেশ সিনেমায় অ’ভিনয়ের জন্য রাজি হয়ে যান। এটি ১৯৮৫ সালের ঘটনা।

কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘মা ও ছে’লে’ সিনেমায় বুলবুল আহমেদের বিপরীতে অ’ভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে রেহানা জলির অ’ভিষেক ঘটে। এরপর ‘গোলমাল’, ‘মহারানী’, ‘প্রায়শ্চিত্ত’, ‘চেতনা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘প্রে’ম প্রতিজ্ঞা’সহ ৪০টি সিনেমায় নায়িকা চরিত্রে অ’ভিনয় করেন। প্রথম সিনেমায় অ’ভিনয় করেই প্রশংসা কুড়ান তিনি। শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অ’ভিনেত্রী ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতে নেন। অ’ভিনয়ের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান তিনি।

‘প্রথম প্রে’ম’ সিনেমায় প্রথম মায়ের চরিত্রে অ’ভিনয় করেন জলি। ৩৫ বছরের অ’ভিনয় ক্যারিয়ারে রেহানা জলি চিত্রনায়ক আলমগীর, রাজ্জাক, ইলিয়াস কাঞ্চন, ওম’র সানী, মান্না, সালমান শাহ, মৌসুমী, শাবনূর, পপি, শাকিব খান, সাইমন ও বাপ্পীর মায়ের চরিত্রে অ’ভিনয় করেছেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শাকিব খানের মা হিসেবে পর্দায় দেখা গিয়েছে তাকে।

রেহানা জলি রুপালি জগতের ঝলমল আলোয় এক সময় দাপিয়ে বেড়ালেও এখন অ’সুখে, অভাব-অনটনে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। পর্দায় অসংখ্য নায়ক-নায়িকাকে রেহানা জলি ভালোবাসার চাদরে আগলে রেখেছেন, কিন্তু আজ বাস্তব জীবনে কোনো নায়ক-নায়িকা তার খোঁজ নেন না। নিষ্ঠুর এই বাস্তবতা মেনে নীরবে কাঁদছেন রুপালি পর্দার এই মা!