‘মাদ্রাসায় পড়ানো হোক বঙ্গবন্ধুর জীবনী’

মা’ওলানা মহিউদ্দিন খান তার আত্মজীবনীতে লেখেন, ‘ভা’রত ভাগ হওয়ার পর পা’কিস্তানের মু’সলমান শাসকরা ভোগ-বিলাস আর ভাগবাঁটোয়ারায় এমনভাবে মত্ত হয়ে পড়েন যে, সাধারণ জনগণ বিশেষ করে পূর্ব পা’কিস্তানের মানুষের সুঃখ-দুঃখের দিকে তারা চোখ তুলেও তাকায়নি।’

এ কথাটিই অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভাবে লেখেন, ‘পা’কিস্তান এসেছে ঠিক, কিন্তু পূর্ব পা’কিস্তানের মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। আম’রা যে তাদের ভাই, এ কথাও তারা মেনে নিতে পারেনি। জুলুম-অ’ত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে পা’কিস্তান শাসকগোষ্ঠী।’

তিনি শাহাদাত আঙুল উঁচিয়ে হুঙ্কার দিলেন, ‘আজ বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়। র’ক্ত যখন দিয়েছি, র’ক্ত আরও দেব। তবুও এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’

আল্লাহ চেয়েছেন বলেই বাংলাদেশের মানুষ এখন স্বাধীন ভূখণ্ডে বুক ভরে স্বাধীন বাতাস গ্রহণ করে। হে আল্লাহ! সব শোকরিয়া তোমা’র জন্য, আলহাম’দুলিল্লাহ। হে জাতির পিতা! আপনার জন্মশতবর্ষে, স্বাধীনতার এই মাসে আপনাকে জানাই সালাম।

বড় নি’র্মম সত্য হল, যে মানুষটির সংগ্রামে বাংলাদেশের জন্ম হল সে মানুষটিকে এ দেশের ধ’র্ম’দরদিরা এখনও ই’মাম হিসেবে মেনে নিতে পারেনি।

অথচ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘ছাত্রাবস্থায় তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহসহ মু’সলিম বীরদের জিহাদের উদাহ’রণ টেনে বক্তব্য দিয়ে পা’কিস্তান আ’ন্দোলনে সাধারণ মানুষের জনসম’র্থন গড়ে তুলতাম।’

মা’ওলানা আবু তাহের মেসবাহ বড় আফসোস করে লিখেছেন, ‘বাইতুল্লাহ সফরের আগে যখন পা’কিস্তান যাই, তখনও পা’কিস্তানের মাদ্রাসার লোকজনকে বঙ্গবন্ধুকে বেই’মান বলে উল্লেখ করতে শুনেছি।’

বঙ্গবন্ধুর ধ’র্মবোধ স’ম্পর্কে জানতে চাইলে বলব, তিনি ছিলেন মা’ওলানা আবুল হাশিমের একান্ত শিষ্য। আর মা’ওলানা আবুল হাশিমের লেখা ‘ইস’লামের ম’র্মকথা’ বই আল-আজহার ও অক্সফোর্ডসহ অনেক নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও পাঠ্য। ভেতরে-বাইরে বঙ্গবন্ধু যে কত বড় ধার্মিক-বিশ্বা’সী-নবীপ্রে’মিক-আওলিয়াভক্ত ছিলেন- এ দেশের মাদ্রাসাপড়ুয়ারা তা জানে না। তখন কলকাতায় ঘনঘন হিন্দু-মু’সলিম দাঙ্গা হতো। বক্তৃতার সময় হিন্দুরা মু’সলমানদের গালি দিত, মু’সলমান নেতারাও হিন্দুদের গালি দিয়ে বক্তৃতা শুরু করতেন।

বঙ্গবন্ধু লিখেন, ‘গালির জবাবে গালি দেয়া তো রাসূলের আদর্শ নয়। দাঙ্গার সময় আম’রা মু’সলমানদের হিন্দুদের মা’র থেকে বাঁ’চাতাম। আবার আ’ট’কে পড়া হিন্দুদের গো’পনে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতাম। এ খবর ফাঁ’স হলে মু’সলমানদের হাতেই আমাদের মা’রা পড়তে হতো; কিন্তু ধ’র্ম নিয়ে দাঙ্গা-ফাসাদ করতে তো কোরআনই নিষেধ করেছে।’

বঙ্গবন্ধু লিখেন, ‘গালির জবাবে গালি দেয়া তো রাসূলের আদর্শ নয়। দাঙ্গার সময় আম’রা মু’সলমানদের হিন্দুদের মা’র থেকে বাঁ’চাতাম। আবার আ’ট’কে পড়া হিন্দুদের গো’পনে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতাম। এ খবর ফাঁ’স হলে মু’সলমানদের হাতেই আমাদের মা’রা পড়তে হতো; কিন্তু ধ’র্ম নিয়ে দাঙ্গা-ফাসাদ করতে তো কোরআনই নিষেধ করেছে।’

কওমি শিক্ষার্থীদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ছিল সনদের মান। বিএনপি-জামায়াত সরকার দেবে দেবে করেও দেয়নি। বঙ্গবন্ধুকন্যা স্বপ্নকে সত্যি করলেন। কওমি শিক্ষার্থীদের আকাশে সনদের চাঁদ এঁকে দিলেন। কওমি তরুণরা এখন মনজমিনে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন বুনছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কওমি কারিকুলামেও বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযু’দ্ধের ইতিহাস স’ম্পর্কে তেমন জানার সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা স্বীকৃতি দিলেন অথচ বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস, মুক্তিযু’দ্ধের ইতিহাস না জেনেই ছে’লেরা বড় বড় আলেম হয়ে বেরোবে।

বঙ্গবন্ধুর ধ’র্মীয় ও মানবিক জীবনের পরিচয় না জানার কারণে এরাই হয়তো একদিন বলবে- বঙ্গবন্ধু ইস’লাম ও মানবতার বন্ধু নয়। বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কয়েকজন কর্মক’র্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তাদের কেউই এ নিয়ে কথা বলতে চাননি।

তবে বর্তমান মহাপরিচালক মা’ওলানা জুবায়ের বলেছেন, ‘আমি সপ্তাহখানেক হল দায়িত্ব পেয়েছি। যতটুকু জানতে পেরেছি, সিলেবাসে মুক্তিযু’দ্ধ-বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাঠ্যপুস্তক নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনাও আছে।’

কওমি মাদ্রাসায় কর্ম’রত বেশক’জন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা সুকৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও কেউ কেউ বলেছেন, কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে বঙ্গবন্ধুর জীবনী অন্তর্ভুক্ত না করলেই নয়। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি। তাকে ধারণ, লালন ও অধ্যয়ন ছাড়া স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়।

লেখক : আল ফাতাহ মামুন