অনলাইনে প্রতারণার নতুন কৌশল

ফেসবুকে দেখা যায় ১৪৯ টাকায় আইফোন, ১৯৯ টাকায় ল্যাপটপ আর ১৬৯ টাকায় স্মার্ট এলইডি টিভি। অবাক হচ্ছেন, মনে হচ্ছে শেরশাহর আমলে চলে গেছেন, যেখানে টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত।

না, এটা বর্তমানে অভিনব এক প্রতারণার কৌশল। ফেসবুকে এমন বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের পকেট কাটছে ‘এবং’ নামের একটি পেজ।

শুধু কী ‘এবং’! ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এমন হাজারো পেজ আছে, যেখানে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের পকেট কাটা হচ্ছে। প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার ক্রাইম ইউনিট বেশ কয়েকটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে। এ রকম একটি চক্র যারা প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম বলছেন, অনলাইনে কেনাকাটার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের বিকল্প নেই। যে-কোনো পেজে বিজ্ঞাপন দেখলেই কেনাকাটা করা যাবে না। দেখেশুনে যাচাই করেই তারপর অর্ডার করতে হবে। তিনি আরো বলেন, প্রতারণা করে এমন পেজগুলো নজরদারির মধ্যে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে ‘এবং’ নামের পেজটি দেখা যাচ্ছে। যেখানে বিজ্ঞাপন দেওয়া রয়েছে, সুবর্ণ সুযোগ মাত্র ১৪৯ টাকায় আইফোন, ১৯৯ টাকায় ল্যাপটপ আর ১৬৯ টাকায় স্মার্ট এলইডি টিভি। পেজটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায় অন্য কথা। মাত্র ৩ জন একটি করে অর্থাৎ তিনটি লটারির মাধ্যমে এসব দেওয়া হবে। তাও অনিশ্চিত। বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি যত খুশি ততবার এই টাকা পাঠাতে পারবেন। আর লটারির মাধ্যমে তিনজনকে দেওয়া হবে একটি করে আইফোন, এলইডি টিভি ও ল্যাপটপ। পেজে দেওয়া নম্বরে ফোন দিয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে পেজে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আছে বলে কেটে দেয়।

এবং’-এর পেজে ঢাকায় কোথাও কোনো অফিসের ঠিকানা পর্যন্ত দেওয়া নাই। ফেসবুকে এমন অসংখ্য অনলাইন শপিং পেজ রয়েছে, যেগুলো শপিংয়ের নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। কিছু পেজ এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে অন্য ধরনের কিংবা নিম্ন মানের পণ্য ডেলিভারি দিচ্ছে। আবার কিছু পেজে অগ্রিম মূল্য পরিশোধের পরেও ভুল পণ্য দিয়ে থাকে। পেজের পক্ষ থেকে পাওয়া যায় না প্রতিকার।

এরকমই আরেকটি শপিং পেজের নাম ’অ্যাস্থেটিক মডস’, যাদের অনলাইন প্রতারণার শিকার ঢাকার তরিকুল ইসলাম রাজন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাজন গত ২ জানুয়ারি ওই পেজে কম্পিউটারের গ্রাফিক্স কার্ডের ব্যাকপ্লেট অর্ডার করেন। পেজের রুলস অনুযায়ী অর্ডার করার সাথেই বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেন। ৫ জানুয়ারি পণ্য হাতে পাওয়ার পর তিনি দেখেন তার অর্ডারকৃত পণ্যের সাথে ডেলিভারি পণ্যের সাইজের কোনো মিল নেই। এরপর সেই ফেসবুক পেজ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে তারা এটার জন্য ভুল স্বীকার করেন। কিন্তু দায়ভার নিতে তারা অপারগতা প্রকাশ করেন।

ভুক্তভোগী তরিকুল ইসলাম রাজন জানান, ’অ্যাস্থেটিক মডস’ পরিচালনা করেন শাওন ভুঁইয়া নামে এক ব্যক্তি। তারা কম্পিউটার গ্রাফিক্স কার্ডের ব্যাকপ্লেট বানিয়ে সেটা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রি করেন। আমি ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে তাদের প্রচারণা দেখে তাদের পেজের মেসেজে যোগাযোগ করে একটি ব্যাকপ্লেট অর্ডার করি। কিন্তু তারা আমার অর্ডার করা কাঙ্ক্ষিত প্রোডাক্ট দেননি। ভুল প্রোডাক্ট দিয়ে আমার সাথে প্রতারণা করেছেন।

রাশিদ শাহরিয়ার নামের একজন ভুক্তভোগী জানান, তিনি ‘লেদার জোন’ নামে এক পেজে একটি লেদারের জ্যাকেটের বিজ্ঞাপন দেখে আকৃষ্ট হন এবং জ্যাকেটটি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পেজটির অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগের এক পর্যায়ে তিনি ফিজিক্যালি পণ্যটি দেখে নেওয়ার জন্য তাদের ঠিকানা চান। কিন্তু অ্যাডমিন ঠিকানা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, আমরা শুধু অনলাইন ডেলিভারি দিয়ে থাকি, ফিজিক্যালি পণ্য বিক্রি করি না।

রাশিদ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমি পণ্যটি দেখে খুবই আগ্রহী হয়েছিলাম। কারণ লেদারের এই জ্যাকেটটির বাজার মূল্য ছিল কমপক্ষে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। কিন্তু তারা আমাকে অফার করেছে মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকা। পরে আমি পণ্যটি অর্ডার করতে চাইলে তারা কুরিয়ার সার্ভিস ফি বাবদ আমাকে ২০০ টাকা বিকাশের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে বলে। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি সেটা পেমেন্ট করি। পরবর্তী সময়ে তারা আমাকে এসএ পরিবহনের মাধ্যমে পণ্যটি পাঠায়।’

তিনি বলেন, ‘আমি এসএ পরিবহনের অফিসে গিয়ে প্যাকেটটি খুলে দেখে নিতে চাই; কিন্তু কুরিয়ার কর্তৃপক্ষ সেটা করতে দেয় না। তারা বলে আপনাকে আগে পেমেন্ট করতে হবে, তারপর খুলতে হবে। আমি বলি প্যাকেট খুলে যদি আমার কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি না পাই তাহলে কী হবে? তাদের জবাব, সেটা আমাদের বিষয় না। আপনি না নিলে আমরা ফেরত পাঠিয়ে দেব। আমি পরে পেমেন্ট করে প্যাকেটটি নিয়ে বাসায় চলে আসি। খুলে দেখি সেখানে আমার অর্ডার করা জ্যাকেটটি নয় বরং অত্যন্ত নিম্নমানের একটি জ্যাকেট, যার বাজার মূল্য ৫০০ টাকার বেশি হবে না। আমি পরে পেজটির ইনবক্স এবং তাদের ফোনে বিষয়টি জানাই। তারা বিষয়টি দেখবে বলে আমাকে তাদের পেজ থেকে ব্লক করে দেয় এবং আমার নাম্বারটিও ব্লক করে দেয়।’

কাজলী আক্তার নামের একজন ক্রেতা জানান, তিনি অনলাইনে এম্ব্রয়ডারি ডিজাইন দেখে একটি থ্রি-পিসের অর্ডার করেন। কিন্তু ডেলিভারি নেওয়ার পর খুলে দেখেন এম্ব্রয়ডারি নয়, সেখানে কাঁচা রঙের কালি দিয়ে আঁকানো।

এদিকে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ক্ষেত্রে তো আর কথাই নেই। ১০ হাজ‍ার টাকা মূল্যের পণ্যগুলো বিভিন্ন পেজে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রির অফার দেয় প্রতারকরা।

এদিকে ই-কমার্স ব্যবসার নামে প্রতারণা করে ২৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেসের নাম অনেকেরই জানা। মাত্র ১০ মাসে তারা ২৬৮ কোটি টাকা প্রতারণা করে নিয়ে যায়। সম্প্রতি এ কোম্পানির ৬ জনকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা সংস্থা।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ই-কমার্সের নামে অনলাইনভিত্তিক মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পরিচালনা করে আসছিল। তাদের কোনো লাইসেন্সই ছিল না। সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত কমিশন দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

প্রতারণার কৌশল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা কোম্পানির ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে শত শত পোস্টের মাধ্যমে ই-কমার্সের কথা বলে সাধারণ মানুষকে লোভনীয় কমিশনের লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। আগ্রহীরা গুগল প্লে স্টোর থেকে একটি মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশন করে। রেজিস্ট্রেশন করার সময় বাধ্যতামূলক আগের রেজিস্ট্রেশনের আপলিঙ্ক আইডির রেফারেন্সে বিকাশ, নগদ, রকেট নম্বরে অ্যাকাউন্টের প্রতিটি আইডির জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। কোম্পানিটি বিভিন্ন ধরনের কমিশন (রেফার কমিশন, জেনারেশন কমিশন, রয়্যাল কমিশন)-এর প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করে আসছিল।

সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল বলেন, লোভনীয় অফার থাকলেই সেখানে কেনাকাটা করা যাবে না। যেগুলো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি তাদের বিষয়টি ভিন্ন। তারা পণ্য হাতে পাওয়ার পর টাকা পরিশোধ করতে বলে। তিনি জানান, আমরা আগের চেয়ে নজরদারি আরো বাড়িয়ে দিয়েছি। প্রতারণার শিকার বা ভুক্তভোগীরা থানায় জিডি করে সাইবার ক্রাইম ইউনিটে যোগাযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।