পৃথিবীর প্রথম মমি আজও সিন্দুকে বন্দি, প্রিয় খাবার ছিল নরমাংস

‘মমি’ শব্দটি শুনলেই নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়! পিরামিডের ভিতর অন্ধকার ঘরে একটা বাক্স, তার ভিতর সারা শরীর ব্যান্ডেজের মতো করে প্যাঁচানো একটা লাশ।

এমনকি মিসরের নাম শুনলেও পিরামিডের সঙ্গে সঙ্গে মমির কথা মনে পড়ে যায়। ‘মমি’ শব্দটি এসেছে ফ্রেঞ্চ শব্দ ‘মোমি’ থেকে। কিন্তু শব্দটির মূল উৎস হলো পারস্য শব্দ ‘মোম’। আর এই মোম থেকে এসেছে আরবি ও ল্যাটিন শব্দ ‘মুমিয়া’। মুমিয়া থেকে এখন এই শব্দটি হয়ে গিয়েছে ‘মমি’। প্রাচীন মিসরীয়রা মনে করত মৃত্যুর পর, মানুষ পরকালে তাদের জীবন আবার ফিরে পাবে। আর সেই জীবনে যাওয়ার জন্য তাদের মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। আর এই সংরক্ষণ করে রাখার জন্য মমি তৈরি করা হতো। তবে মমি কেবল মিসরের ধনী ও উচ্চবর্গীয় ব্যক্তিদেরই করা হতো।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা মানেই অদ্ভুত আর রহস্যময় নানা উপকথার ভাণ্ডার। তাদের এসব গল্প শুধু যে বিংশ শতাব্দীকে চমকেই দিচ্ছে, তা কিন্তু নয়। এর মধ্যে ছড়িয়ে আছে সেকালের সমাজবিজ্ঞান, জ্যোতিষ, গণিত এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্রেরও ভ্রূণ। এছাড়াও প্রকৃতির সমস্ত রহস্যকেই ভিন্ন ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন নামে চরিত্রায়ণ করে এই উপকথাগুলো। ‘ওসাইরিস ‘ তেমনই এক আশ্চর্য জীবনের গল্প। বিস্ময়কর এক চরিত্র এটি।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন মমি বলে ধারণা করা হয় ওসাইরিসের মমিকে। গবেষকদের ধারণা মিশরীয়দের মমির অধ্যায় শুরু হয়েছিল ওসাইরিসের থেকে। ওসাইরিস বা ওসিরিসকে নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত আলোচনাগুলো করেছেন গ্রিক পন্ডিত ডিওডোরাস ও প্লুটার্ক। যদিও তার বহু আগে থেকেই পিরামিড গাত্রে খোদাই করা হয়েছে ওসাইরিসের জীবনকাহিনী। সেইসব পিরামিড স্টোরি থেকেই প্রথম জানা যায় ওসাইরিসের জীবন, হত্যাচক্রান্ত ও পুনরুত্থানের গল্প। পুরাণের মতে মিশর ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো মমিও ওসাইরিস।

প্যাপিরাস সল্ট থেকে মৃতদেহ মমি করে পচনরোধের যে বিজ্ঞান, তারও প্রথম হাতেকলমে ব্যবহার হয় ওসাইরিসের উপরই। তবে ওসাইরিসের কথায় আসার আগে, আসুন জেনে নেয়া যাক কে এই ওরাইসিস? কোথা থেকে জন্ম তার? পৃথিবীর দেবতা গেব বিয়ে করেন তার বোন আকাশ আর স্বর্গের দেবী নুটকে। ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে প্রাচীন মিশরে খুবই পবিত্র বলে মনে করা হত ৷ রক্তের বিশুদ্ধতা ধরে রাখার জন্য মিশরের রাজপরিবারগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভাইয়ের সঙ্গে বোনের বিয়ে হয়ে এসেছে। এমনকি বাবার সঙ্গে মেয়ের। বিয়ের পর যৌথজীবনে ঢুকে দেবতা গেব ও নুট একে একে জন্ম দিলেন চার ছেলেমেয়ের।

এই চার সন্তানের মধ্যে প্রথম জনই হলেন দেবতা ওসাইরিস বা ওসিরিস। মিশরীয় পুরাণ অনুসারে পুনর্জন্ম, মদ, শস্য তথা উর্বরতার দেবতা ছিলেন ওসাইরিস। পৃথিবী ও আকাশের সঙ্গমে তার জন্ম, প্রকৃতির সম্মিলিত শক্তির প্রতীক বলা চলে তাকে। বয়ঃপ্রাপ্তির পর নিজের সহোদরা বোন সুন্দরী আইসিসকে বিয়ে করেন ওসাইরিস। আইসিস ছিলেন যাদুবিদ্যা, মাতৃত্ব ও প্রকৃতির দেবী। সারল্য আর শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী দেবীও তিনি। মিশরের রাজা মানে ফারাওদের বলা হত ‘আইসিসের সন্তান’।

গেবের দ্বিতীয় পুত্র, ওসাইরিসের ভাই সেথ ছিলেন মরুভূমি, ঝড় আর অন্ধকারের দেবতা। ছোটোবেলা থেকেই সেথ অহংকারী, দুর্দমনীয়, কপট। গেব তার দুই পুত্রের মধ্যে রাজত্ব ভাগ করে দিতে চেয়েছিলেন। সেই অনুসারে ঠিক হল মিশরের দক্ষিণ অংশ বড় ভাই ওসাইরিসের দখলে থাকবে। আর উত্তর অংশ থাকবে কনিষ্ঠ সেথের দখলে। তবে ভাগাভাগিতে আপত্তি ছিল সেথের। সে চেয়ে বসল সম্পূর্ণ মিশরের আধিপত্য। এই অসঙ্গত দাবিতে রুষ্ট হয়ে এবং তার অপশাসনের প্রমাণ পেয়ে বাবা গেব ওসাইরিসকেই সমগ্র মিশরের একছত্র অধিপতি ঘোষণা করেন।

রাজা হিসেবে ওসাইরিস ছিলেন প্রজাদরদি, সুশাসক। যে সময় তিনি সিংহাসনে বসেন, তখন প্রাচীন মিশরের মানুষ ছিল বর্বর। মানুষ মানুষেরই কাঁচা মাংস খেত। নিজেরও এটি প্রিয় খাবার হলেও রীতি বাতিল করলেন নিজেই। আসলে সেসময় মিশরে এমন আরো অনেক কিছুই রীতি হিসেবে মানা হত। এরপর মিশরীয়দের চাষবাস করতে শেখালেন তিনি। ফলাতে শেখালেন গম, বার্লি, আঙুর। তৈরি করলেন উৎকৃষ্ট মদ। শুধু সুসভ্য করাই নয়, কৃষিকাজ এবং তামার ব্যবহার সম্পর্কেও মিশরীয়দের শিক্ষিত করে তোলেন রাজা ওসাইরিস।

বর্বর প্রাচীন মিশরীয়দের মধ্যে নিয়ে আসেন শৃঙ্খলা। গড়ে তোলেন প্রশাসক, স্থপতি ও কৃষিবিজ্ঞানীদের ফৌজ। সমাজের নিয়মকানুন, আইন-শৃঙ্খলা প্রণয়ন করতে তার আমন্ত্রণে এগিয়ে আসেন জ্ঞানের দেবতা থোথও। দুই দেবতায় মিলে শিল্পকলা আর বিজ্ঞানে পারদর্শী করে তোলেন মিশরবাসীকে। পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন ওসাইরিস ও আইসিস। যখনই রাজ্য ছেড়ে অন্য দেশ ভ্রমণে যেতেন রাজা, রাজত্বভার দিয়ে যেতেন রানি আইসিসের উপর। তবে সুখ জিনিসটাই ক্ষণস্থায়ী।

এই দুই দেবতার সুখী দাম্পত্যেও কাঁটা হয়ে দাঁড়াল তাদেরই লোভী ভাই সেথ। তারও আগে ওসাইরিস নিজেই ভ্রান্তিবশত জড়িয়ে পড়লেন সেথের স্ত্রী নেফথিসের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে, যার পরিণামে তাদের একটি ছেলে জন্মায়। এই অবৈধ সন্তানই শেয়াল – দেবতা আনুবিস। গেব ও নুটের ছোট মেয়ে ছিলেন নেপথিসা ওসাইরিস ও আইসিসের মতো নেপথিসও বিয়ে করেন নিজের দাদা অন্ধকারের দেবতা সেথকে।

এদিকে নেপথিসের গোপন দুর্বলতা ছিল বড়ভাই ওসাইরিসের উপর। তবে ওসাইরিস ছিলেন স্ত্রীর প্রতি একনিষ্ঠ। অন্যের প্রেমপ্রস্তাবে সাড়া দেবেন না। তাই অন্য ফন্দি আঁটলেন দেবী নেপথিস। একদিন তিনি আইসিসের ছদ্মবেশে হাতে পানপাত্র নিয়ে গেলেন ওসাইরিসের ঘরে। একে ছদ্মবেশ, তার উপর মদের প্রভাব, চিনতে ভুল করলেন ওসাইরিস। মিলিত হলেন নেফথিসের সঙ্গে। তাদের মিলনেই জন্ম নিল মৃত্যু বা পরলোকের দেবতা আনুবিস।

চেহারার দিক থেকে অবশ্য ওসাইরিসের তুলনায় সেথের সঙ্গেই ‘শেয়াল দেবতা ‘ আনুবিসের মিল বেশি। যা হোক, স্ত্রীর পরকীয়া আর অবৈধ সন্তানজন্মের কথা যখন সেথের কানে গেল, রাগে দিকবিদিক জ্ঞান হারালেন তিনি। মনস্থির করলেন ওসাইরিসকে হত্যা করেই এর প্রতিশোধ নেবেন। মাঝেমধ্যে বিদেশভ্রমণের শখ ছিল ওসাইরিসের। বেড়াতে বেড়াতে চলে যেতেন সুদূর ভারতবর্ষের সীমা অব্দি। এমনই একবার, যখন রাজ্যভার রানি আইসিসের উপর দিয়ে রাজা বিদেশে বেড়াতে গেছেন, সেসময় গোপনসূত্রে রানি আইসিস জানতে পারলেন রাজাকে মারার জন্য নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে ভাই সেথ।

ছোটবেলায় একবার সেথকে লাথি মেরেছিলেন ওসাইরিস। সে অপমান ভোলেনি সেথ। তার উপর পৃথিবীর রাজা হওয়ার লোভ, তাকে পাগল করে তুলেছিল। আসলে ওসাইরিসের সৌভাগ্য আর ক্ষমতাকে শুরু থেকেই হিংসা করত সেথ। নানাভাবে চেষ্টা চালাত তার ক্ষতি করার। সেই ঈর্ষার আগুনে ঘি ফেলেছিল স্ত্রী নেপথিস ও ওসাইরিসের অবৈধ সম্পর্ক। ইথিওপিয়ার রানির সহায়তায় এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক তৈরি করলেন সেথ। এক মানুষ দীর্ঘ সেই সিন্দুকের গায়ে অসাধারণ কারুকাজ। খুব গোপনে ওই সিন্দুক তৈরি করা হয়েছিল ওসাইরিসের শরীরের মাপে।

ওসাইরিস বিদেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরলে তার রাজত্বের ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এক বিরাট ভোজসভার আয়োজন করেন সেথ। ভাইকে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানান সেই মহাভোজে। আমন্ত্রণ করেন নিজের ৭২ জন বন্ধু ও অনুসারীকেও। ভোজসভা যখন জমে উঠেছে, হাতে হাতে ঘুরছে সুস্বাদু পানীয়ে ভরা পানপাত্র, তখনই বুদ্ধি করে সেথ সেই বিরাট কাঠের সিন্দুকটাকে নিয়ে আসেন ভোজসভায় , আর ঘোষণা করেন যার শরীরের মাপের সঙ্গে এই সিন্দুকের মাপ মিলে যাবে তাকেই উপহার দেয়া হবে এই মহার্ঘ সিন্দুক।

এত অপূর্ব কারুকাজ করা সিন্দুক কেউ আগে দেখেনি। সবাই একে একে গিয়ে সিন্দুকের ভেতর শুয়ে দেখতে লাগল। তবে কারো শরীরের মাপের সঙ্গেই মিলল না সিন্দুকের মাপ। মিলবে কী করে! এই সিন্দুক যে তৈরি হয়েছে ওসাইরিসের মাপে। একে একে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন সবাই। সবার শেষে এল ওসাইরিসের পালা।

ভাইয়ের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে কোনোরকম সন্দেহ না করেই ওসাইরিস গিয়ে শুয়ে পড়লেন প্রকাণ্ড সিন্দুকে। সিন্দুকে প্রবেশ করার পর রাজা ওসাইরিস দেখলেন তার শরীরের মাপের সঙ্গে সিন্দুকের মাপ একেবারে মিলে গেছে। তবে দুষ্টু সেথ বাইরে থেকে সেই সিন্দুক বন্ধ করে তার উপর ঢেলে দিলো গলানো সীসা। তারপর ওসাইরিসসহ সেই সিন্দুক নিক্ষেপ করা হল নীলনদের জলে। সিন্দুকের ভিতর ছটফট করতে করতে মারা গেলেন দেবতা ওসাইরিস। সিন্দকের ভেতরেই তার শরীর প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে রয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে।