শিশুর চরিত্র গঠনে মা-বাবার করণীয়

আজকের শিশুরাই আগামীর কর্ণধার। এই শিশুদের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হাফিজে কোরআন, মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির।

এদের থেকেই জন্ম নেবে সমাজপতি, রাষ্ট্রপতি, ডাক্তার ও মহাকাশজয়ী বিজ্ঞানী। তাই ভবিষ্যতে দীপ্তি ছড়ানো এই শিশুদেরকে ফুলের মতো পরিচর্যা করে গড়ে তুলতে হবে। নতুবা এদের থেকে সুবাস ছড়ানোর আগেই এদেরকে বিনষ্ট করে দিতে পারে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা অসুরেরা। কাজেই আদর্শ সমাজ ও উন্নত পরিবেশ গঠন করতে হলে শিশুরা কেমন করে উন্নত চরিত্র এবং অনুপম আদর্শের অধিকারী হতে পারে সে বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া আবশ্যক।

শিশুদেরকে আদর্শবান করে গড়ে তুলতে না পারলে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। যদি কারো আখলাক-চরিত্র নষ্ট হয়ে যায় তবে এর কারণে সে নিজেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং এ ক্ষতির প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদি সব কিছু পরিব্যাপ্ত হয়ে উপরিউক্ত ক্ষেত্রসমূহে বিরাট অকল্যাণ ডেকে আনে। এর জন্য শিশুর চরিত্র গঠনের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সদা সচেতন থাকা আবশ্যক। চরিত্র গঠনের দুটি দিক রয়েছে।

১. আখলাকে যামিমাহ্ বা দুষ্টু চরিত্রের প্রতি ঘৃণার মনোভাব সৃষ্টি করা। অর্থাৎ অহংকার, মিথ্যা, ধোঁকাবাজি, গীবত, চোগলখোরি, মূর্খতা, উদাসিনতা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা ইত্যাদির প্রতি শিশুদের হূদয়ে ঘৃণা সৃষ্টি করা। ২. আখলাকে হামিদাহ্ বা উন্নত চরিত্রের মাধুরীর দ্বারা বিভূষিত করা। অর্থাৎ বিনয়ী, সততা, আমানতদারি, অঙ্গীকার পূরণ করা, দানশীলতা, পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদাচার ইত্যাদি মহৎগুণাবলি শিক্ষা দেওয়া।

শিশুদের সব থেকে কাছের মানুষ হলেন মা -বাবা। তাই শিশুর সুন্দর চরিত্র গঠনে মাতা-পিতার দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। মাতা-পিতা শিশুকে যে চরিত্র শিক্ষা দেবেন শিশুরাও সে চরিত্র শিখে গড়ে উঠবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি শিশুই ফিতরাত তথা ইসলাম গ্রহণের যোগ্যতাসহ জন্মগ্রহণ করে। তারপর তার মা-বাবা তাকে ইয়াহুদি, খ্রিষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়। (বুখারি-মুসলিম) চরিত্রবান হওয়ার যোগ্যতা প্রতিটি শিশুর মধ্যেই বিদ্যমান আছে।

যদি শিশুর পিতা-মাতা এ ব্যাপারে যত্নবান হয় এবং পরিবেশ যদি সুন্দর চরিত্র গঠনের অনুকূলে থাকে, তবে শিশুর মধ্যে অনুপম চরিত্রের বিকাশ ঘটে। আর যদি পিতা-মাতা এ বিষয়ে যত্নবান না হয় কিংবা পরিবেশ যদি চরিত্র গঠনের অনুকূলে না থাকে তবে শিশুর চরিত্র বিনষ্ট হয়ে যায়। কাজেই শিশুর চরিত্র গঠনের বিষয়ে পিতামাতার ভূমিকা অপরিসীম।

পিতা-মাতার উচিত প্রথমেই সন্তানদেরকে আল্লাহর অস্তিত্বের কথা, তাঁর একত্ববাদের কথা এবং তাঁর ওপর ঈমান আনার কথা বলা। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, আসমান-জমিনের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা এবং এ সবকিছুর যে একজন স্রষ্টা রয়েছেন তার কথা সন্তানদেরকে বুঝানো ও অবহিত করা। এরপর পর্যায়ক্রমে তাদেরকে রাসুল, ফিরিশতা, কোরআন মাজিদ, কবর, হাশর, আখিরাত ইত্যাদির প্রতি ঈমান আনয়নের কথা বলা। শিরক, বিদআতের অকল্যাণ ও ভয়াবহতার কথা তাদের সামনে তুলে ধরা। এ প্রসঙ্গে হজরত লুকমান (আ.) তাঁর ছেলেকে যে নসিহত করেছিলেন, তা কোরআন মাজিদে এভাবে উল্লেখ রয়েছে-

১. ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বৎস! আল্লাহর সাথে শিরক করো না। নিশ্চয়ই শি‌রক হচ্ছে চরম জুলম।’ (সুরা লুকমান, আয়াত-১৩) হজরত লুকমান (আ.)-এর প্রথম নসিহত হলো শি‌রক পরিহার করে তাওহিদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাস মনের মধ্যে দৃঢ়মূল ও স্থায়ী করার নির্দেশ।

২. ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বৎস! কোনোকিছু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মাটির নিচে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। (সুরা লুকমান, আয়াত-১৬) নসিহতের এই অংশে লুকমান (আ.) আল্লাহরতায়ালার ইলম ও কুদরতের ব্যাপকতা ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মতার অকাট্য বর্ণনা পেশ করেছেন। আল্লাহ সম্পর্কে এ আকিদা মানুষকে সব প্রকার গোপন ও প্রকাশ্য গুনাহ্ এবং নাফরমানি থাকে বিরত রাখে।

৩. ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বৎস! সালাত কায়েম করবে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত- ১৭) আকিদার ক্ষেত্রে তাওহিদ যেমন মূল, তেমনি আমলের ক্ষেত্রে নামাজ হচ্ছে সবকিছুর মূল। নাবালেগ সন্তান-সন্ততি যেন শিশুকাল থেকেই নামাজ কায়েমের ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে যায় তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে নামাজ আদায় করতে আদেশ করবে, যখন তারা সাত বছর বয়সে পদার্পণ করবে এবং নামাজের জন্য তাদেরকে শাসন করবে যখন তারা দশ বছর বয়সে পৌঁছবে। আর তখন তাদের জন্য আলাদা শয্যার ব্যবস্থা করবে।’ (আবু দাউদ শরিফ)

৪. ইরশাদ হয়েছে, ‘সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজে বাধ দেবে। (সুরা লুকমান, আয়াত-১৭) নসিহতের এই অংশটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আর তা হলো এই যে, ঈমানদার মানুষমাত্র নিজেকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকতে পারে না; বরং সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের বাধা দান করাও তার অন্যতম দায়িত্ব।

৫. ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করবে। এটাই দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সুরা লুকমান, আয়াত-১৭) শিশুদের এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে শৈশবকাল থেকেই তারা বিপদ-আপদে ধৈর্যশীল ও সাহসী হয়ে গড়ে ওঠে।

৬. ইরশাদ হয়েছে, ‘অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করবে না।’ (সুরা লুকমান, আয়াত-১৮) শিশুদেরকে শৈশব থেকেই শিক্ষা দেওয়া উচিত যে, তারা যেন নিজেদেরকে সাধারণ লোক থেকে শ্রেষ্ঠ মনে না করে; বরং নিজেদেরকে তাদের একজন মনে করে ও দশজনের সাথে মিলেমিশে জীবনযাপন করে।

৭. ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করবে না। কারণ আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান, আয়াত-১৮) অর্থাৎ, শিশুদেরকে এ শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলা যে, গর্বভরে ঔদ্ধত্যের সাথে বিচরণ করো না। আল্লাহ ভূমিকে সব বস্তু হতে নত ও পতিত করে সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের সৃষ্টিও এ মাটি দিয়েই। তোমরা এর উপর দিয়েই চলাফেরা করা-নিজের নিগূঢ় তত্ত্ব বুঝতে চেষ্টা কর। আত্মাভিমানীদের ধারা অনুসরণ করে অহংকারভরে বিচরণ করো না। আল্লাহ কোনো অহংকারী আত্মাভিমানীকে পছন্দ করেন না।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যার অন্তরে সরিষা দানা পরিমাণ ঈমান আছে সে জাহান্নামে যাবে না, পক্ষান্তরে যার অন্তরে সরিষা দানা পরিমাণ অহংকার আছে সে জান্নাতে যাবে না।’ (মুসলিম, হাদিস নং- ১৩২) অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আর তিনজনকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। অহংকারী, দাম্ভিক। যেমন তোমরা আল্লাহর কিতাবে পাও, তারপর আলোচ্য আয়াত তেলাওয়াত করলেন। আর দান করে খোঁটা প্রদানকারী কৃপণ ব্যক্তি; এবং শপথের মাধ্যমে বিক্রয়কারী। (মুসনাদে আহমাদ : ৫/১৭৬)

৮. ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তুমি পদক্ষেপ করবে সংযতভাবে।’ (সুরা লুকমান, আয়াত-১৯) অর্থাৎ শিশুদেরকে হাঁটা-চলার ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়া যে, দৌড়-ঝাঁপসহ চলো না, যা সভ্যতা ও শালীনতার পরিপন্থি। এভাবে চলার ফলে নিজেরও দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার আশংকা থাকে বা অপরের দুর্ঘটনার কারণও ঘটতে পারে। আবার অত্যধিক মন্থরগতিতেও চলো না। যা গর্বস্ফীত আত্মাভিমানীদের অভ্যাস, যারা অন্য মানুষের চাইতে নিজের অসার কৌলিন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে চায়।

অথবা সেসব স্ত্রীলোকদের অভ্যাস, যারা অত্যধিক লজ্জা-সংকোচের দরুন দ্রুতগতিতে বিচরণ করে না। অথবা অক্ষম ব্যাধিগ্রস্তদের অভ্যাস। প্রথমটি তো হারাম। দ্বিতীয়টি যদি নারী জাতির অনুসরণে করা হয় তাও না-জায়েয। আর যদি এ উদ্দেশ্য না থাকে, তবে পুরুষের পক্ষে এটা একটা কলঙ্ক। তৃতীয় অবস্থায় আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন। সুস্থ থাকা সত্ত্বেও রোগগ্রস্তদের রূপ ধারণ করা। (ইবন কাসীর, কুরতুবী)

৯. ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং তুমি তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করবে, স্বরের মধ্যে গর্দভের স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (সুরা লুকমান, আয়াত-১৯) অর্থাৎ, শিশুদেরকে কথা বলার ক্ষেত্রে সুন্দর ও মার্জিতভাবে কথা বলার শিক্ষা দেওয়া। অহেতুক, হই-চই ও চিৎকার-চেঁচামেচি করে গাধার মতো কথা বলা থেকে বারণ করা। শিশুদের সামাজিক রীতিনীতি শিক্ষাদানের পর্যায়ে লুকমান (আ.)-এর এই নয়টি নসিহতের গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলোর ভিত্তিতে শৈশবকাল থেকেই শিশুদেরকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরিহার্য এবং এ কাজ পিতা-মাতাকেই যথাযথভাবে আঞ্জাম দিতে হবে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘পিতা-মাতা সন্তানকে ভালো আদব-কায়দা ও স্বভাব-চরিত্র শিক্ষাদান অপেক্ষা উত্তম কোনো দান দিতে পারে না।’ (তিরমিযি শরিফ) সন্তানদেরকে চরিত্রবান করে গড়ে তুলার জন্য একদিকে পিতা-মাতা যেমনিভাবে সচেষ্ট থাকবেন, এর পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়াও করবেন। কেননা, আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া মানুষের চেষ্টা কখনো ফলপ্রসূ হতে পারে না।

কোরআনুল কারীমে আল্লাহতায়ালা নেক বান্দাদের অন্যান্য গুণের পাশাপাশি দোয়া করার গুণটার কথাও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘(আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা সবসময় এই বলে দোয়া করে) হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করো যারা আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর এবং আমাদেরকে মুত্তাকিনদের জন্য ইমাম বানিয়ে দাও।’ (সুরা ফুরকান,আয়াত-৭৪)