মধুর নামে সাধারণ মানুষ কী খাচ্ছে!

মধুর নামে সাধারণ মানুষ কী খাচ্ছে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে! যেখানে ডাবর, পতঞ্জলি, ঝাণ্ডুর মতো ভারতীয় নামিদামি কম্পানিগুলো ভেজালের আশ্রয় নিচ্ছে।

এমন চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেছেন ভারতের সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের (সিএসই) বিজ্ঞানীরা।

তাদের মতে, ভেজাল চিহ্নিত করার পরীক্ষায় উতরাতে ব্যর্থ হয়েছে বেশির ভাগ কম্পানির মধু। এসব কম্পানির বিশাল বাজার রয়েছে বাংলাদেশেও।

ইন্ডিয়া টুডে, দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমসসহ ভারতীয় প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতে মধুতে ভেজাল মেশানোর এসব প্রতিবেদন বেশ আলোচিত।

এতে বলা হয়, দেশটির শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ কম্পানিই চীনে তৈরি চিনির বিশেষ সিরাপ মিশিয়ে মধু বিক্রি করে। যদিও কম্পানিগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, এই রিপোর্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

কতটা বিশুদ্ধ তা জানার জন্য ভারতের খাদ্যপণ্য গবেষকরা ও সিএসই ১৩টি বড় ও ছোট কম্পানির মধু পরীক্ষা করে। কারণ এসব কম্পানি পণ্যের প্রচারণায় দাবি করে তাদের মধু শতভাগ খাঁটি ও ভেজালমুক্ত। কিন্তু পরীক্ষায় ভারতের শীর্ষস্থানীয় মধু ব্র্যান্ডগুলোতে চিনির সিরাপ পাওয়া গেছে।

জার্মানিতে অবস্থিত এনএমআর ল্যাব টেস্টে ১৩ ব্র্যান্ডের মাত্র তিনটি উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। অর্থাৎ ১০টি ব্র্যান্ডের মধুতেই ভেজাল। মধুতে চিনির সিরাপ মেশানো হয়েছে কি না, তা ধরার জন্য এ পরীক্ষা বৈশ্বিক স্বীকৃত।

সিএসই জানায়, ডাবর, পতঞ্জলি, বৈদ্যনাথ, ঝাণ্ডু, হিটকারি এবং অ্যাপিস হিমালয়ার মতো বড় বড় ব্র্যান্ড এনএমআর বা নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তিনটি কম্পানি হচ্ছে সাফোলা, মার্কফেডসোনা ও ন্যাচারস নেক্টার।

সিএসইর ফুড সেফটি ও টক্সিন দলের প্রগ্রাম পরিচালক অমিত খুরানা বলেন, আমরা পরীক্ষায় যা পেয়েছি, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। ব্যবসায় ভেজাল মেশানোর মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা এখন ভারতেও পরীক্ষায় ধরা পড়ছে না। পণ্যে ভেজাল মেশাচ্ছে এটি তো আছেই, তার চেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, তা ধরা অনেক কঠিন। আমরা জানতে পেরেছি, চিনির সিরাপকে এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত করে মেশানো হয় যে এটা পরীক্ষায় ধরা পড়ে না।

গত বছর ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এফএসএসআই ) জানিয়েছে যে গোল্ডেন সিরাপ, সুগার সিরাপ ও রাইস সিরাপ ব্যবহার করা হচ্ছে মধুতে ভেজাল মেশানোর জন্য।

এরপর সিএসই চিনা পোর্টাল থেকে জানতে পারে তারা ফ্রুক্টোজ সিরাপ বিক্রি করে। এটা মধুতে মেশালে ভারতের পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে যে ৫০-৮০ শতাংশ ভেজাল মেশালেও সেটা পরীক্ষায় ধরা পড়বে না।

প্রথমে এই স্যাম্পলগুলো গুজরাটে ন্যাশনাল ডেয়ারি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সেন্টার ফর অ্যানালিসিসি ইন লাইভস্টক অ্যান্ড ফুডে (সিএএলএফ) পরীক্ষিত হয়। সেখানে প্রায় সব ব্র্যান্ডই পরীক্ষায় পাস হয়। এর কারণ ভারতে যে মধুর শুদ্ধতা মাপার পরীক্ষা তাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি চিনির এ সিরাপ ধরা পড়ে না। আগে মধুর মিষ্টতা বাড়াতে ভুট্টা, আখ, চাল ও বিটের চিনি মেশানোয় পরীক্ষায় তা ধরা পড়ে যেত।

তবে এখন মেশানো চিনির সিরাপ শুধু নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্সেই ধরা পড়তে পারে।

এদিকে ডাবর, পতঞ্জলি ও ঝাণ্ডু কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের মধুতে কোনও ভেজাল নেই। দেশের বিভিন্ন অংশের প্রাকৃতিক উৎস থেকে এসব মধু সংগ্রহ করা হয়। মধুগুলো ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার নিয়ম-কানুন মেনেই বাজারজাত করা হয়।

এ বিষয়ে ডাবরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, সাম্প্রতিক এই রিপোর্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আমরা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে চাই, ডাবর মধু ১০০ ভাগ খাঁটি এবং সম্পূর্ণ দেশীয়।

পতঞ্জলি আয়ুর্বেদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আচার্য বালাকৃষ্ণাও এটি ভারতের প্রাকৃতিক মধুর সুনামহানির চেষ্টা বলে অভিযোগ করেছেন।