মাস্ক না পরলে বেতের বাড়ি!

মাস্ক পরলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে দূরে থাকা যায়, এ কথা সবারই জানা। তবে এখন থেকে মাস্ক পুলিশের ‘বেতের বাড়ি’ও ঠেকাবে।

ঘরের বাইরে, জনসমাগমস্থলে সবার মুখে মাস্ক নিশ্চিত করতে সরকার এমন বিধান আরোপের কথাই ভাবছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মানুষকে শুধু সচেতনতার কথা বলে মাস্ক পরানো যাচ্ছে না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মাস্ক পরার বিকল্পও নেই। তাই মাস্ক না পরলে শাস্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বেতের বাড়ির বিধান আরোপ করা হতে পারে। আজ-কালের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

এদিকে দোকানপাট খোলা রেখেই চলমান বিধি-নিষেধ আরো এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত কয়েক দিন ধরে গণপরিবহন খুলে দেওয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরনের (ইন্ডিয়ান ভেরিয়েন্ট) জন্য সরকার সে সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছে। আপাতত গণপরিবহন খুলছে না। ঈদের আগে খুলবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

গতকাল সোমবার মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে লকডাউন বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে মাস্ক পরার বিষয়টি নিশ্চিত কিভাবে করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। মাস্ক না পরলে তাত্ক্ষণিক কী শাস্তি দেওয়া যায়, ওঠে সে কথাও। তখন বেতের বাড়ির প্রস্তাব করেন একজন। কিন্তু প্রচলিত আইনে বেতের বাড়ি দেওয়ার সুযোগ নেই।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আরেকজন আলোচক প্রয়োজনে আইনি সুযোগ তৈরির প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান যে পরিস্থিতি, এখন আর পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। মানুষকে শুধু সচেতনতার কথা বলে মাস্ক পরানো যাচ্ছে না, যাবেও না। আমরা প্রকাশ্যে যতই বলি মাস্ক পরতে হবে, মানুষ কিন্তু তা মানছে না। তাই শাস্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বেতের বাড়ির বিষয়টি কিভাবে আইনি পরিকাঠামোতে আনা হবে, তা ভাবা হচ্ছে বলে বৈঠকের একাধিক সূত্র জানায়।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, আজ মঙ্গলবার এ বিষয়ে একটি ছোট বৈঠক হতে পারে। এতে বিষয়টির আইনি সমাধান বের করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন চাওয়া হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জানা যায়, বেত্রাঘাতের নিয়ম ব্রিটিশ আমলের একটা পর্যায়ে ছিল। পরে তা বাতিল করা হয়। মানুষকে কোনো শাস্তি দিতে গেলে সেই শাস্তির আইনগত ভিত্তি লাগে। বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধানের কথা বলা আছে। বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি শাস্তির বড় বিষয়গুলো রয়েছে পেনাল কোডে। কিন্তু পেনাল কোডে বেত্রাঘাতের বিধান নেই। বেত্রাঘাতের শাস্তি দিতে গেলে নতুন আইন করতে হবে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ আরিফ খান।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো শাস্তি একটি মৌলিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এটা কোনো আদেশ বা প্রজ্ঞাপন দিয়ে হওয়া সম্ভব নয়। সরকার হয়তো আইন প্রণয়ন করবে অথবা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এর বৈধতা দিতে পারে।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হুইপিং (চাবুক) অ্যাক্ট নামে ১৯০৯ সালের একটি আইন এখনো চালু আছে। কিন্তু সেই আইনে কী কী অপরাধ করলে চাবুক মেরে শাস্তি দেওয়া যাবে তার উল্লেখ আছে। তাই মাস্ক পরার ক্ষেত্রে সেটা ব্যবহার করা যাবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বৈঠকে উপস্থিত একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ আইনে সংশোধনের মাধ্যমেও বেতের বাড়ির বিধান সংযুক্ত করা হতে পারে।

অন্যদিকে লকডাউনের সময় বৃদ্ধির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এই সময় অফিস-আদালত ও গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। তবে শপিং মল রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। হোটেল-রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে আগের নিয়ম বহাল থাকবে। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে আগের যে সিদ্ধান্ত ছিল, সেটাই থাকবে।

বৈঠক সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দোকানপাট ও শপিং মল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত ডিএমপি কিভাবে বাড়িয়ে দিল, সেই প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে শ্রম আইন অনুযায়ী শপিং মল খোলা থাকার নিয়ম রাত ৮টা পর্যন্ত, তাই ৯টা পর্যন্ত ঘোষণার আইনগত ভিত্তি নেই বলে একজন কর্মকর্তা মত দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেই সময় ৯টার বদলে ৮টা পর্যন্ত করা হয়।

বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি ভারতীয় সংক্রমণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে লকডাউন বাড়ানোর যুক্তি তুলে ধরেন। সবাই বিষয়টিকে আমলে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। কঠোর লকডাউনে থাকার ঘোষণা দিলেও এরই মধ্যে গত রবিবার থেকে শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছে। চালু হয়েছে অভ্যন্তরীণ বিমান। কিছু বিশেষ ফ্লাইট চালু হয়েছে আন্তর্জাতিক রুটেও। তবে গণপরিবহন, দূরপাল্লার যানবাহন ও নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।