পিঠে সিলিন্ডার বেধেঁ মোটরসাইকেলে মাকে বহনকারী সেই ছেলের করোনা জয়

ঝালকাঠির নলছিটিতে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৭০ অবস্থায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মাকে বাঁচানোর জন্য শরীরে ৮ লিটার মাত্রার চলমান ২০ কেজি ওজনের অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে মোটরসাইকেলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সেই সন্তান জিয়াউল হাসান টিটুও আক্রান্ত হয়েছিলেন করোনায়।

হাসপাতালে টানা ছয়দিন মায়ের সেবা করে নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। অবশেষে টানা ১৫ দিন করোনার সাথে যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছেন কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা টিটু।

গতকাল রবিবার (৯ মে) দুপুরে তার মোবাইলেফোনে করোনা নেগেটিভের রিপোর্ট আসে। গত বৃহস্পতিবার তিনি নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে নমুনা দিয়েছিলেন।

টিটু বলেন, আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। করোনা পজিটিভ থাকাকালে আমার শরীরে কোনো উপসর্গ ছিলো না। তারপরেও টানা ১৫ দিন আমি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছি।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সব কাজ করেছি। এজন্যই দ্রত আমি সুস্থ হয়ে গেছি। আমি সুস্থ হওয়ার পেছনে আমার মা রেহেনা বেগম ও ছোট ভাই রাকিবুল হাসান ইভানের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের সেবাযত্নে আমি এখন সম্পূর্ণ করোনামুক্ত।

তিনি বলেন, মায়ের সেবা করতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছি। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। মমতাময়ী মাকে বাঁচাতে হবে, এটাই ছিল আমার একমাত্র চাওয়া। আমার মা সুস্থ হয়ে বাড়িতে এসেছেন, আমি করোনা আক্রান্ত হয়েছি। সেই মা আমার যত্ন করেছেন।

গত ২৩ এপ্রিল বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মাকে নিয়ে সেই মোটরসাইকেলে করেই নলছিটির সুর্য্যপাশা গ্রামের বাড়িতে ফেরেন ছেলে টিটু। পরের দিন নলছিটি হাসপাতালে তার পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়।

সেই থেকে বাড়িতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুস্থ হয়ে ওঠেন টিটু। ১৫ দিন তিনি বই পড়ে ও ল্যাপটপে ইন্টারনেট ব্যবহার করেই তার সময় কাটে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার কক্ষে খাবার দিয়ে আসতেন সেই মমতাময়ী মা রেহেনা বেগম ও ছোট ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগরে ছাত্র রাকিবুল হাসান ইভান।

কোনো কিছুর প্রয়োজন হলেই রিভান হাজির হয়ে যেতো টিটুর কাছে। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস ও শরীরে পিপিই পড়ে ভাইয়ের সার্বক্ষণিক সেবা করেছেন তিনি। মা ও ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে টিটু।

মা রেহানা বেগমের জানান, মায়ের সেবা করতে গিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে টানা ১৫ দিন ঘরের ভেতরে ছিলেন টিটু। টিটুর বাবা মরহুম আব্দুল হাকিম মোল্লা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

বাবার মৃত্যুর পরে ছেলেরাই মায়ের দেখাশুনা করেন। স্বামীকে হারানোর অভাব কখনোই বুঝতে দেয়নি তার তিন ছেলে। বড় ছেলে মেহেদী হাসান মিঠু পুলিশের এসআই। তিনি খুলনার একটি থানায় কর্মরত আছে।

রেহেনা বেগম বলেন, আমার সব স্বপ্নই এখন সন্তানদের ঘিরে। সন্তানরা যেমন আমার অসুস্থতার সময় নিজেদের জীবন বিপন্ন করে বাঁচানো চেষ্টা করেছেন, এটা আমার অনেক বড় পাওয়া। আমিও চাই তারা আলোকিত মানুষ হোক।

তাদের নিয়ে আমার গর্ব হচ্ছে, যেমনটি দেশের মানুষের হচ্ছে। আমি যখন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরি, তখন অনেক পত্রিকা ও টিভিতে আমার সন্তানকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে। আমি দেখেছি সবগুলোই, আপ্লুত হয়েছি সন্তানদের এমন ভালোবাসায়। তাদের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।

১৭ এপ্রিলের ঘটনা

রেহেনা বেগমের অক্সিজেন সাপ্লাই ঠিক রাখতে শরীরের সাথে গামছা দিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে রেখেছিলেন টিটু। মোটরসাইকেলের পেছনে করোনায় আক্রান্ত মা বসে আছেন।

আর এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মহাসড়কে থাকা চেকপোস্ট থেকে সেই করোনা রোগী বহন করা মোটরসাইকেলটিকে দ্রুত ও অবাধে যেতে দিয়েছে পুলিশ। ওই সময় পুলিশের এক সদস্য একটি ছবি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট করে।

টিটু জানান, গত ৯ এপ্রিল তার মার করোনা শনাক্ত হলে নলছিটির সূর্যপাশা বাড়িতে বসেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ১৭ এপ্রিল দুপুরে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়।

নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফোন দিলে অ্যাম্বুলেন্স অন্য রোগী নিয়ে বরিশাল চলে গেছে বলে জানানো হয়। লকডাউনের মধ্যে কোন গাড়ি যখন পাচ্ছিলেন না, তখন সংকটাপন্ন মায়ের জীবন বাঁচাতে মোটরসাইকেলে টিটু নিজের শরীরে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে হাসপাতে নিয়ে আসেন।