ইউরোপ, আমেরিকা বা দুবাইয়ে নয়, এটি ফরিদপুরের ভাঙ্গায়

দূর আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ ক্যানভাসে আঁকা বৃহৎ একটি সাদা ফুল। সেই ফুলের পাপড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রাণী।

একটু কাছে এলেই স্পষ্ট হয়, এটি একটি সড়ক মোড়। যেখানে চক্রাকারে ছড়িয়ে থাকা মসৃণ সড়কগুলো দিয়ে সাঁই সাঁই করে ধেয়ে চলছে গাড়ি। সেই চলন্ত গাড়ির ওপর দিয়ে আবার এঁকেবেঁকে বিভিন্ন দিকে নেমে গেছে একাধিক সড়ক। রাতের বেলায় সড়কবাতিগুলো জ্বলে উঠলে সৃষ্টি হয় ভিন্ন এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের।

আধুনিক স্থাপত্যকর্মের এই নিদর্শনটি ইউরোপ, আমেরিকা বা দুবাইয়ে নয়, গড়ে উঠেছে ফরিদপুর জেলার গ্রামীণ জনপদ ভাঙ্গায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম অগ্রাধিকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ের নান্দনিক এই সড়ক মোড়টি ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ।

পদ্মা সেতু চালু হলে এই মোড় ব্যবহার করে জেলাগুলো সরাসরি যুক্ত হবে রাজধানীর সঙ্গে। এতে সংযোগ সৃষ্টি হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র মোংলা, পায়রা ও বেনাপোল বন্দরের। সড়কের পাশাপাশি তৈরি হবে রেল যোগাযোগ।

ভাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা লোকমান হোসেন বলেন, ‘এই এলাকাটি যে এভাবে বদলে যাবে তা এখানকার কেউ কল্পনাই করতে পারেনি। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগেও ভাঙ্গা ছিল চায়ের দোকানে ঠাসা শুধু একটি বাস স্টপেজ। ক্ষমতায় এসে নির্মাণ করেন ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক। এরপরই মোড়টির গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এখন এই জায়গাটি দেখে বিশ্বাসই হতে চায় না এটি আমাদের সেই ভাঙ্গা। মনে হয় ইউরোপ-আমেরিকার কোনো জায়গা। এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে মোড়টির সৌন্দর্য দেখতে।’

ভাঙ্গা উপজেলা শহর এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার। এ প্রবেশদ্বার দিয়ে পশ্চিমে রাস্তা চলে গেছে গোপালগঞ্জ হয়ে খুলনা-বেনাপোল পর্যন্ত। দক্ষিণে মাদারীপুর, বরিশাল হয়ে পটুয়াখালীর সাগরসৈকত কুয়াকাটা, উত্তরে ফরিদপুর শহর হয়ে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। পূর্বে মাদারীপুর হয়ে পদ্মা সেতু পার হলেই ২০-২২ মিনিটে ঢাকা। ঢাকার জুরাইন থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দেশের এই প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে এশিয়ান হাইওয়ের করিডর ১-এর অংশ।

এদিকে সড়ক বিভাগের তথ্যমতে, এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৬ হাজার ৮৯২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই বিপুল কর্মযজ্ঞে অর্থ জোগানদাতা বাংলাদেশ সড়ক বিভাগ। বর্তমানে ও ভবিষ্যতে পদ্মা সেতু হওয়ার পর যাতে কোনো যানজট না লাগে সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকেই এমন আধুনিক নকশায় ভাঙ্গা মোড়টি নির্মাণ করা হয়েছে।

একটি এক্সপ্রেসওয়ে যে একটি দেশের অর্থনীতির আমূল বদলে দিতে পারে তার অন্যতম উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। তিন বছরের যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দক্ষিণ কোরিয়া শুধু গিয়ংবু এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে স্বল্প সময়ে বিশ্বের বুকে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে হিসেবে আবির্ভূত হয়।

মহাসড়কটির সঙ্গে সংযুক্ত হয় দেশের ছোট-বড় অসংখ্য শহর। দেশজুড়ে গড়ে ওঠে হাজারো শিল্প-কারখানা। তেমনি পদ্মা সেতুসহ ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে গড়ে উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও আবাসিক এলাকা।