করোনার মাঝে ডেঙ্গুর হানা!

চলতি মাসে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কমপক্ষে ৯১০ জন৷ এই সংখ্যা বছরের প্রথম ছয় মাসের প্রায় তিনগুণ৷ আগের ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৯২৷ খবর ডয়চে ভেলের।

শুধু তাই নয়, গত বছরের পুরো ১২ মাসের সঙ্গে এই বছরের জুলাই মাসের ১৮ দিন তুলনা করলে আক্রাস্ত প্রায় সমান৷ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১২ মাসে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৩৯২ জন৷

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্বের অধ্যাপক কবিরুল বাশার তাই বর্তমান পরিস্থিতকে ভয়াবহ মনে করছেন৷ তিনি আশঙ্কা করেন, ঈদে লোকজন যে দল বেঁধে বাড়ি যাচ্ছেন, তারা শহর থেকে গ্রামে ডেঙ্গু নিয়ে যাচ্ছেন৷ ডেঙ্গু এবার গ্রামেও ছড়িয়ে পড়বে৷

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৭৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন৷ তাদের মধ্যে ঢাকায় ৭৪ জন এবং ঢাকার বাইরে একজন৷

দেশের হাসপাতালগুলোতে এখন মোট ৪০৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন৷ এর মধ্যে ঢাকায় ৩৯৮ জন৷ ঢাকার বাইরে পাঁচ জন৷ ঢাকার ৪১টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এখন ডেঙ্গু রোগী আছে৷

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় স্পষ্ট যে, এখন ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেই ডেঙ্গু রোগী বেশি৷ যেমন, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১১ জন, আদ দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আট জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে আট জন, সরকারি শিশু হাসপাতালে দুইজন৷ কোভিডের চাপের কারণে সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থার অবনতির কারণে অনেক ডেঙ্গু রোগীই এখন বেসরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন৷

কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার সব এলাকায়ই এখন এডিস মশার ঘনত্ব বেশি৷ জুন মাসে যে সার্ভে করি, তাতে দেখা যায়, গত বছরের চেয়ে এডিস মশার ঘনত্ব প্রায় ২০ গুণ বেশি৷ ঢাকার এমন কোনও এলাকা নেই যেটা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে নেই৷

তিনি বলেন, এবার বুষ্টি হয়েছে অনেক, আদ্রতা বেশি, তাপমাত্রা বেশি- এইসব কারণে এবার এডিস মশার প্রজনন অনেক বেশি৷ তার মতে, ডেঙ্গুর প্রজনন ঠেকাতে সচেতনতা ও আগাম প্রস্তুতি কম ছিল৷

তার মতে, ২০১৯ সালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব যখন দেখা দেয় তার আগে কোরবানির ঈদ ছিল৷ ঈদে অনেক মানুষ গ্রামে যায়৷ এরপরই সারাদেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে৷ এবারও সেই পরিস্থিতি হতে পারে৷ কারণ, ঢাকায় ডেঙ্গুর পরিস্থিতি খারাপ৷ অনেকেই বুঝতে পারছেন না যে তারা ডেঙ্গু আক্রান্ত৷ এখন তারা গ্রামে যাচ্ছেন৷ ফলে ডেঙ্গু গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে৷

তিনি দাবি করেন, সরকারি হিসেবে এ বছর ডেঙ্গুতে কেউ মারা না গেলেও আনঅফিসিয়ালি চার জন মারা গেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে৷ আইইডিসিআর তাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে৷

তবে আইইডিসিআর জানায়, তারা দুইজনের মুত্যু ডেঙ্গুতে কিনা তা খতিয়ে দেখছেন৷

আইইডিসিআর-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশে এখন সারাবছরই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন৷ কিন্তু আমরা দেখছি এবার হেমোরেজিক বেশি৷ রক্তক্ষরণ হয়, যা আতঙ্কের৷ আমরা পরীক্ষা করে দেখছি ডেঙ্গুর নতুন কোনও স্ট্রেন হয়েছে কিনা৷

তার মতে, করোনার কারণে এখন পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা চাপের মুখে আছে সত্য, কিন্তু বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসায় সব ধরনের সক্ষমতা আছে৷ জ্বর হলে এখন সবাই করোনা টেস্ট করান, ডেঙ্গু টেস্ট করান না৷ করোনা টেস্টের সাথে সাথে ডেঙ্গু টেস্টও করাতে হবে৷ জ্বর ডেঙ্গুর কারণেও হচ্ছে৷ আর চিকিৎসা দ্রুত শুরু করতে হবে৷ কারণ, চিকিৎসা দ্রুত শুরু করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সহজ৷

তিনি বলেন, এবার লকডাউনের কারণে মানুষ দীর্ঘ সময় বাড়িতে থাকছেন৷ এ কারণেই বাড়িতে পানি ও ময়লা জমতে দেয়া উচিত নয়৷ এটা অনেকে খেয়াল করছেন না৷ তাই বাড়িই এবার এডিস মশার বড় প্রজননক্ষেত্র৷ আর শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ এবার শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি৷