এটা রাস্তা নয়, চাষ করা জমি’

গ্রামের নাম পালপাড়া। কিন্তু লোকজন উপহাস করে ডাকে কাদার-গাঁ পালপাড়া। বর্ষা এলেই একপ্রকার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে গ্রামটির মানুষ। বর্ষা মৌসুমে লোকজন কোনো কাজে গ্রামের বাইরে যেতে চায় না কাদার জন্য। গ্রামে বিদ্যালয় থাকলেও এ সময় শিক্ষকেরা সেখানে সঠিক সময় যেতে পারেন না। শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় যেতে চায় না।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ও হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের ৯টি গ্রামের মধ্যে পালপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের চিত্র এটি। অপর আটটি গ্রাম—জলুবার, নারায়ণজন, নদীরপার, মাছুয়াপাড়া, মুকুলের বাজার, কুমারপাড়া, বরাতি, বানিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদেরও এ রাস্তার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ওই ৯ গ্রামের প্রায় ১২ হাজার লোকের চলাচলের জন্য ইকরচালী ইউনিয়নের ওকড়াবাড়ি বাজার থেকে হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের মুকুলের বাজার পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার রাস্তাটি একমাত্র উপায়।

বিজ্ঞাপন
রাস্তাটির দুই পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ পাকা করা হয়েছে। কিন্তু বরাতি বাজার থেকে পালপাড়া মন্দির পর্যন্ত ৬০০ মিটার অংশ পাকা না করায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ওই গ্রামগুলোর মানুষ। বর্ষা এলেই একপ্রকার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে তারা।

কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, পুরো বর্ষায় এই রাস্তা কাদায় ভরে থাকে। তাঁরা এ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বহু ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেই। শুধু রাস্তাটির কারণে ৯ গ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ স্থবির হয়ে গেছে।
বরাতি বাজারে কথা হয়, বরাতি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেকেন্দার আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, রাস্তাটির দুই পাশে চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দুটি বাজার রয়েছে। ১০ বছর আগে রাস্তাটির ওকড়াবাড়ি বাজার থেকে বরাতি বাজার পর্যন্ত দুই কিলোমিটার এবং এক বছর আগে পালপাড়া মোর থেকে মুকুলের বাজার পর্যন্ত এক কিলোমিটার অংশ পাকা করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পালপাড়া মন্দির থেকে বরাতি বাজার পর্যন্ত ৬০০ মিটার অংশ পাকা করা হয়নি। ফলে শুকনা মৌসুমে ধুলাবালু আর বর্ষায় কাদাপানির কারণে এই রাস্তা দিয়ে স্কুলের শিক্ষার্থীসহ পথচারীদের চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

আজ শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, কাদা মাড়িয়ে রাস্তা দিয়ে জুতা হাতে কয়েকজন পথচারী ওই রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। নারায়ণজন গ্রামের মফিজুল ইসলাম প্রাণপণ চেষ্টায় তাঁর রিকশা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ওই রাস্তা দিয়ে বাইসাইকেলে করে যাওয়ার সময় ওই রাস্তার পালপাড়ার মোড়ে বাইসাইকেলসহ কাদায় পড়ে যায় বরাতি গ্রামের আফজাল হোসেন। এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটা রাস্তা নোওয়া, চাষ করা জমি, একহাঁটু কাদা। কাদার জন্যে বাইরের লোক হামার গ্রামোত আইসে না। হামরাও যাবার পাই না। তাও কায়ও দেখে না। বড় বড় কথা কয়া জামরা ভোট নেয়, তামরাও এলাকাত আইসে না।’

আফজালের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নদীরপার গ্রামের আবু বক্কর বলেন, ‘এই রাস্তার জন্য লাঙল-নৌকাত ভোট দিছি। ইউনিয়ন, উপজেলার চেয়ারম্যানকেও অনুরোধ করছি। যে দলের নেতা আইসে তারেটে রাস্তা কোনা পাকা করি চাওছি। কিন্তু কায়ও হামার কষ্ট বোঝছে না। রাস্তার কোনা পাকা না বানায় হামার ফসলের ভালো দাম পাওছি না।’

হাতে জুতা নিয়ে কাদা মাড়িয়ে তারাগঞ্জ সদরের দিকে যাচ্ছেন জলুবার গ্রামের সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকার কত কিছু করে, খালি হামার গ্রামের কাছত রাস্তা কোনায় পাকা করিবার না পারে। একনা পাকা না করায় হামার কষ্ট চিরকাল।’

ইকরচালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই রাস্তা পাকাকরণের জন্য স্থানীয় সাংসদকে অনুরোধ করেছি। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি জানিয়েছি। উপজেলা উন্নয়ন কমিটির সভায়ও একাধিকবার বিষয়টি উপস্থাপন করেছি। কিন্তু কাজ হয়নি।’

তারাগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আহম্মেদ হয়দার জামান বলেন, ‘ওই রাস্তার দুই পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ পাকা করা হয়েছে। মাঝখানে ৬০০ মিটার অংশ পাকাকরণের জন্য স্থানীয় সাংসদের সঙ্গে কথা হয়েছে। বরাদ্দ চেয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই রাস্তাটির ওই অংশ পাকাকরণের বরাদ্দ পাব।’