ওসি প্রদীপের ‘জলসা ঘর’ থেকে রাতের বেলায় ভেসে আসত কা’ন্নার শব্দ

থা’না থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের নাজিরপাড়া গ্রাম। এ গ্রামের নূর মোহাম্ম’দের বাড়িটি ছিল ওসি প্রদীপের ‘জলসা ঘর’। মা’দকের আসর সহ অ’নৈতিক নানা কাজের কেন্দ্র ছিল ওই বাড়িটি।শুধু কি এসব, এ বাড়িতে বসেই ওসি প্রদীপ মা’মলা নিতেন। জো’র করে চেকে স্বাক্ষর নেয়া, আ’সামি ধ’রা, ছাড়া এসব চলতো এ বাড়িতে। এখানে থাকতেন ওসি প্রদীপের ঘনিষ্ঠ পু’লিশ সদস্যরাও। ওই বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে আরেক থা’না হিসেবেই পরিচিত।সাবেক সে’না কর্মক’র্তা মেজর সিনহা হ’ত্যা ঘটনার পর ২রা আগস্ট রোববার সন্ধ্যায় থা’নার পু’লিশ সদস্যরা বাড়িটি ছেড়ে চলে যান। সঙ্গে করে নিয়ে যান বাড়ির ভেতরের আসবাবপত্র।গতকাল সরজমিন দুই তলাবিশিষ্ট বাড়িটিতে গিয়ে দেখা মিলে থা’না পরিচালনা করার আলামত। বাড়িটির নিচ তলায় হাতের ডান পাশের কক্ষটিতে গিয়ে দেখা যায় মা’মলার অসংখ্য গুরুত্বপূর্র্ণ কাগজপত্র। দু’তলায় গিয়ে দেখা মিলে ম’দের বোতল, ইয়াবা খাওয়ার সরঞ্জাম, পু’লিশ সদস্যদের জুতা, ম’দের বোতল, ব্যাংকের খালি চেক, আর্মড পু’লিশের পোশাকসহ পু’লিশ সদস্যদের থাকার নানা আলামত।অ’ভিযোগ রয়েছে, বাড়িটির মালিক মুদি দোকানি নূর মোহাম্ম’দকে গত বছর দোকান থেকে তুলে নিয়ে ক্রসফায়ার দেয় টেকনাফ থা’না পু’লিশ। নূর মোহাম্ম’দের স্ত্রী’’ লায়লা বেগম অ’ভিযোগ করে বলেন, স্বামী নূর মোহাম্ম’দকে গত বছর মা’র্চ মাসে বাড়ির পাশে দোকান থেকে ধরে নিয়ে যায় টেকনাফ থা’না পু’লিশ। পরে তাদের কাছ থেকে চল্লিশ লাখ টাকা দাবি করেন পু’লিশ সদস্যরা। পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করে দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি আমা’র স্বামীর। তাকে তারা ক্রসফায়ার দিয়ে দেয়। ঘটনার দুই মাস পরে এখান থেকে আমাদের বের করে দেয়া হয়। বাড়ি থেকে আমাদের কিছুই নিতে দেয়া হয়নি। পরে ওসি প্রদীপ কুমা’রকে দলিল দেখালে দলিলটিও তারা নিয়ে নেয়।

অ’ভিযোগ রয়েছে, নূর মোহাম্ম’দের স্ত্রী’’ লায়লা বেগমকে তার দুই সন্তান সহ বাড়ি থেকে বের করে দেন ওসি। এরপর থেকে বাড়িটি দখলে নেন এই পু’লিশ কর্মক’র্তা। নিজের বাড়ি থাকতেও লায়লা বেগম মানুষের বাড়িতে বাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করছেনলায়লা বেগম বলেন, আমা’র স্বামীর বি’রুদ্ধে কোনো মা’মলা ছিল না। তারপরও তাকে তারা বিনা কারণে মে’রে ফেলে। নূর মোহাম্ম’দের মা আবেদা খাতুন কা’ন্নাজ’ড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আজকে আমা’র ছে’লে নেই। ওসি প্রদীপ আমা’র ছে’লেকে মে’রে ফেলেছে, টাকাও নিয়েছে। তখন যদি বলতো বাড়িটি দিয়ে দেয়ার জন্য দিয়ে দিতাম। কিন্তু আমা’র ছে’লেকে মা’রতে দিতাম না। এখন খুব বিপদে আছি। ছে’লে বউ আর নাতিরা থাকার সমস্যায় ভুগছে।’এদিকে এই বাড়িটি ওসি প্রদীপের নি’র্যাতন সেল হিসেবে পরিচিত ছিল। নিরীহ মানুষকে টার্গেট করে ধরে নিয়ে এসে এখানেই প্রথমে রাখা হতো তাদের। করা হতো নি’র্যাতন। তারপর তাদের সঙ্গে চলতো দেন-দরবার। টাকা না দিলে দেয়া হতো ক্রসফায়ার, দিলেও দেয়া হতো ক্রসফায়ার। তবে সুবিধা করতে না পারলে এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হতো মূল থা’নায়। পরে ইয়াবা বা অ’স্ত্র দিয়ে গ্রে’প্তার দেখানো হতো। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় সময় রাতের বেলায় কা’ন্নার শব্দ পেতেন বাড়ির আশেপাশের লোকজন।

তেমন একজন এই এলাকার বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিশেষ করে মধ্যরাতে অনেকের কা’ন্নার শব্দ আম’রা এখানে শুনতাম। পু’লিশের গালাগালি শুনতাম। কিন্তু তখন আম’রা ভ’য়ে কারো সঙ্গে কথা বলতাম না। এই বাড়ির আশেপাশেও কেউ যেতো না। ওসি প্রদীপ নিয়মিত এখানে এসে অফিস করতেন। আম’রা তা দেখেছি। যখন তিনি আসতেন এলাকার মানুষ তখন ভ’য়ে থরথর করে কাঁপতো। তার সামনে ভুলেও কেউ পড়তেন না।জানা গেছে, টেকনাফ থা’নার ওসি প্রদীপের একটি অ’পারেশন টিম ছিল। সেই টিমের সদস্যদের মূল আস্তানা ছিল ওই বাড়িটি। টিমের মধ্যে ছিল বেশ কয়েকজন এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল। তাদের মধ্যে এসআই সঞ্জিত দত্ত ছিল ওসি প্রদীপের সেকেন্ড ম্যান। সকল কিছুর দেখভাল করতেন তিনি। দেন-দরবারও হতো তার মাধ্যমে। ওসির সঙ্গে সার্বক্ষণিক থাকতেন এসআই রুবেল দাশ, কনস্টেবল সাগর দেব, এসআই মিঠুন ভৌমিক। এই তিনজনকে নিয়ে চলতেন তিনি। টেকনাফ থা’নার শাহ্‌পরীর দ্বীপ পু’লিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ দিপক বিশ্বা’স ছিলেন ওসি প্রদীপের ভাগিনা। এসআই সুবির পাল, কাম’রুজ্জামান, মশিউর রহমান (হোয়াইক্যং ফাঁড়ির) ইনচার্জ।

অ’ভিযোগ রয়েছে, তিনিই সবচেয়ে বেশি ক্রসফায়ার দিয়েছেন টেকনাফ থা’না এলাকায়। ওই বাড়িটির অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিল এএসআই ফখরুল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে নূর মোহাম্ম’দের বাড়ির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাকে সেখানকার ইনচার্জ বলা হতো। বাকি সদস্যরা এই থা’নায় তাদের অ’পকর্মগুলো ঘটাতো। আরো একজন উল্লেখযোগ্য ছিল এসআই নাজিম। টেকনাফ থা’নার বিভিন্ন ফাঁড়ির ইনচার্জরা এখানে এসে যোগ দিতেন জলসায়। পু’লিশের বিভিন্ন অ’প’রাধমূলক কর্মকা’ণ্ডের বৈঠক হতো এখানে। এসব বৈঠকে যোগ দিতেন এলাকার মা’দক কারবারিরা। শুধু তাই নয়, অ’ভিযোগ রয়েছে, ক্রসফায়ারের যেসব গো’পনীয় তালিকা করা হতো সেগুলোও হতো এখানে।প্রদীপের এই জলসা ঘরে নি’র্যাতনের শিকার হয়েছেন এমন একজন ভুক্তভোগী ফরিদা বেগম ওরফে কাজল। চলতি বছরের শুরুতে মা’দক চো’রাচালানের অ’ভিযোগে এই নারীসহ তার ভাই আবদুর রহমান এবং স্বামী আবদুল কাদেরকে আ’ট’ক করেছিলেন ওসি প্রদীপ কুমা’র দাস। দুইদিন ওই বাড়িতে আ’ট’কে রেখে নি’র্যাতনের পর ফরিদা বেগম ওরফে কাজলকে ইয়াবা দিয়ে কোর্টে চালান দেয়া হয়। তবে বাঁচতে পারেননি কাজলের ভাই আবদুর রহমান এবং কাজলের স্বামী আবদুল কাদের। পু’লিশের হাতে ধ’রা পড়ার পড়েও কথিত ক্রসফায়ারে নি’হত হন তারা। আরেক ভুক্তভোগী টেকনাফের পুরান পল্লান পাড়ার বেলুজা ও আমিনা খাতুন বলেন, ৫ই জুলাই দিনদুপুরে টেকনাফ থা’না পু’লিশের এএসআই নাজিমের নেতৃত্বে একদল পু’লিশ ঘরে ঢুকে আমিসহ ঘরের লোকজনকে ব্যাপক মা’রধর করে। এরপর আলমিরা ভেঙে দুই ভরি স্বর্ণ, দেড় লাখ টাকা ও জায়গা জমির কাগজপত্র লুট করে। এসময় তাদের ওপর নি’র্যাতন চালিয়ে টেনেহিঁচড়ে পরিবার সদস্য কবির আহম’দসহ তাদেরকে থা’নায় নিয়ে মা’রধর করে। পরে তাদের ওই বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়েও তাদের ওপর নি’র্যাতন করা হয়।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে ‘তাদের ছেড়ে দেয়ার নামে নগদ দুই লাখ টাকা ঘুষ নেয় পু’লিশ অফিসার নাজিম। তবে ১শ’ পিস করে ইয়াবা দিয়ে কারাগারে চালান দেয়। দেড় মাস কারাভোগ শেষে দুজন জামিনে বেরিয়ে আসলেও এখনো কারাভোগ করছে পরিবারের আরেক সদস্য কবির। কথিত ওই থা’নার পাশের বাড়ির বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন শাবু। তিনি থা’না যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। তাকেও ডেকে নিয়ে আ’ট’ক করে এসআই নিজাম উদ্দিন। তাকে পাশের বাড়ির কথিত থা’নায় না নিলেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মূল থা’নায়। সেখানে থা’নার তিন তলায় তাকে দুইদিন আ’ট’কে রেখে টাকা দাবি করেন। পরে পাঁচ লাখ টাকা দিলেও তাকে পাঁচ শ’ ইয়াবা দিয়ে গ্রে’প্তার দেখানো হয়। ওই থা’নার পাশের বাড়ির আব্দুল আমিন ৮ নং ইউনিয়নের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। টেকনাফ বাজারের নিউমা’র্কেট এলাকায় তাদের পারিবারিক দোকান থেকে তাকে আ’ট’ক করেন এসআই ফকরুল। পরে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দুই লাখ টাকা দেয়ার পরে তাকেও পাঁচ শ’ ইয়াবা দিয়ে গ্রে’প্তার দেখানো হয়।অ’ভিযোগ রয়েছে, কথিত ওই থা’নার পু’লিশ টিম টেকনাফের প্রায় দুই হাজার দোকানে ফুলের টব দেয়ার নাম করে সাত শ’ টাকা করে চাঁদা নিয়েছিলো। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন শ’ টাকা করে ফুলের টব সরবরাহ করলেও বাকি চার শ’ টাকা তারা লুটপাট করেছে। এমন অনেক অ’ভিযোগ রয়েছে তাদের বি’রুদ্ধে। অ’ভিযোগ রয়েছে, টেকনাফ থা’নার কথিত ওই থা’নার সদস্যদের বলা হতো ‘ওসির টিম’। এই টিমে থা’নার কয়েকজন কর্মক’র্তাসহ পুরো থা’না এলাকাজুড়ে অনেক সোর্স জ’ড়িত রয়েছে। এই টিমের সদস্যরা ওই বাড়িটিকে দখল নিয়ে অ’বৈধ কার্যক্রম চালাতো। এই টিমের নেতৃত্বে মূল থা’নার তিন তলায় ‘টর্চার সেল’ পরিচালনার অ’ভিযোগও করেছেন অনেক ভুক্তভোগী। তবে ওই বাড়িটিই ছিল তাদের প্রধান টর্চার সেল। অ’ভিযোগ রয়েছে, এই টিমের সদস্যরা কোনো অ’ভিযানে গেলে পু’লিশের কোনো গাড়ি ব্যবহার করা হতো না। ব্যবহার করা হতো সাদা ও কালো গ্লাসের মাইক্রোবাস। এসব অ’ভিযানে আ’ট’ককৃতদের নিয়ে আসা হতো এই বাড়িটিতে এবং নিয়ে যাওয়া হতো মেরিন ড্রাইভসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায়।

x