কম্পিউটার ব্যবসাকে বিদায় জানাল তোশিবা

জাপানভিত্তিক তোশিবা আনুষ্ঠানিকভাবে পার্সোনাল কম্পিউটার (পিসি) ব্যবসাকে বিদায় জানিয়েছে। এর ফলে বাজারে তোশিবা ব্র্যান্ডের আর কোনো নতুন পিসি মিলবে না। খবর বিবিসি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি অনেকটা নীরবে ডায়নাবুক পিসি নির্মাণ বিভাগের অবশিষ্ট ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ মালিকানা শার্প করপোরেশনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে তোশিবা। এর মধ্য দিয়ে পিসি ও ল্যাপটপ উৎপাদনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাল প্রতিষ্ঠানটি।

বৈশ্বিক পিসি বাজারে টানা কয়েক বছর ধরেই সরব উপস্থিতি নেই তোশিবার। ২০১৮ সালে শার্পের কাছে নিজেদের ল্যাপটপ ব্যবসা বিভাগের ৮০ দশমিক ১ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এবার পিসি বিভাগের অবশিষ্ট মালিকানা বিক্রির মধ্য দিয়ে ৩৫ বছরের পুরনো ব্যবসার ইতি টানল তোশিবা।

বৈশ্বিক পোর্টেবল পিসি বাজারে অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত ছিল তোশিবা। ১৯৮৫ সালে বাজারে আসা প্রতিষ্ঠানটির ‘টি১১০০’ ল্যাপটপ ছিল প্রথম মূলধারার পোর্টেবল কম্পিউটার। ১৯৯১ সালে অ্যাপলের পাওয়ার বুক আসা পর্যন্ত খুব বেশি বদলায়নি ওই চিত্র। নিজেদের স্যাটেলাইট, পোর্টেজে এবং কোসিমো লাইনের ল্যাপটপ দিয়ে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে বাজার আধিপত্য ধরে রেখেছিল তোশিবা।

বর্তমানে পিসি বাজারে সরব উপস্থিতি না থাকলেও প্রিন্টিং ও স্টোরেজ ডিভাইস বাজারে এখনো প্রথম সারিতেই রয়েছে তোশিবা। পাশাপাশি নিউক্লিয়ার এনার্জি, খুচরা ও ভারী যন্ত্রপাতি নির্মাণেও উপস্থিতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

বৈশ্বিক বাজারে কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের মেমোরি চিপ সরবরাহকারী হিসেবে প্রথম সারিতে রয়েছে তোশিবা। বর্তমানে কম্পিউটার ও স্মার্টফোন মেমোরি চিপ বাজারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক স্যামসাং। বেশ কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে তোশিবা এর আগে মেমোরি চিপ ব্যবসা বিভাগ বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।

ওই সময় অ্যাপল, গুগল, ব্রডকম ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠান তোশিবার মেমোরি চিপ বিভাগ কিনতে আগ্রহ জানিয়েছিল। সর্বশেষ তাইওয়ানভিত্তিক ফক্সকন ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে তোশিবার মেমোরি চিপ বিভাগ অধিগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে কয়েকজন অংশীদারের কারণে প্রতিষ্ঠানটির মেমোরি চিপ বিভাগ বিক্রির উদ্যোগ আটকে যায়, যা নিয়ে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

জানা যায়, দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক এসকে হাইনিক্স ইনকরপোরেশন ও চিপ নির্মাতা ব্রডকম তোশিবার চিপ ব্যবসা বিভাগ অধিগ্রহণে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা দাখিল করেছিল। উভয় প্রতিষ্ঠান বিভাগটি অধিগ্রহণে ১ হাজার ৭৯৮ কোটি ডলার প্রস্তাব করেছিল।

ওয়েস্টিংহাউজ ইলেকট্রিক তোশিবা করপোরেশনের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এটি যুক্তরাষ্ট্রে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বিলম্ব করায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তোশিবাকে। ভর্তুকি দিতে হয় কয়েক বিলিয়ন ডলার। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তাই মেমোরি চিপ ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।

বাইরের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিভাগটি অধিগ্রহণে আগ্রহী হলেও তোশিবা ও জাপান সরকারের চাওয়া ছিল স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান বিভাগটি অধিগ্রহণ করুক। যদিও এ পর্যন্ত কোনো স্থানীয় ক্রেতা তোশিবার চিপ বিভাগ কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি।

বহুজাতিক কোম্পানি তোশিবা ব্যবসা পুনর্গঠন ও ওয়েস্টিংহাউজ ইলেকট্রিকের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এর আগে মূল ব্যবসা থেকে মেমোরি চিপ ব্যবসা আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে সময় মার্কিন কম্পিউটার ডাটা স্টোরেজ কোম্পানি ওয়েস্টার্ন ডিজিটাল বিভাগটি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করে। বিভাগটির ২০ শতাংশের মালিকানা পেতে ২৭০ কোটি ডলার পরিশোধে আগ্রহী ছিল প্রতিষ্ঠানটি।

চলতি বছরের শুরুর দিকেও তোশিবার বিরুদ্ধে একটি আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছিল। নিজেদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান তোশিবা আইটি-সার্ভিসেস করপোরেশনের ২ হাজার কোটি ইয়েন (১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার) লেনদেন প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ওই অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি তদন্তে নিশ্চিত করতে পারেনি তোশিবা। উল্লেখ্য, অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটি তোশিবার ডিজিটাল সার্ভিসেস করপোরেশন ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত।

এর আপে ২০১৫ সালে একটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ছয় বছরের হিসাব থেকে কর পূর্ববর্তী ১৫ হাজার ২০০ কোটি ইয়েন বাদ দিয়ে আর্থিক স্টেটমেন্ট সংশোধন করেছিল কোম্পানিটি। একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে মুনাফা বেশি দেখানো প্রমাণিত হওয়ায় এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। এ ঘটনার পর অবিরাম অস্থিরতায় রয়েছে তোশিবা। ২০১৫ সালের ঘটনার জেরে পদত্যাগ করেন প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন নির্বাহী কর্মকর্তা। কয়েক কোটি ডলার লোকসানে পড়ে নিজেদের মার্কিন পারমাণবিক ব্যবসা ও ক্রাউন-জুয়েল মেমোরি-চিপ ইউনিটের বিক্রি।

সামগ্রিক দিক বিবেচনায় খুব একটা ভালো সময় পার করছে না তোশিবা। বিভিন্ন ব্যবসা বিভাগ বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

x