ব্যর্থ হওয়ার অভ্যাস থাকতে হবে: জ্যাক মা

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে গেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম সবার আগে আসে তারমধ্যে আলীবাবা গ্রুপ অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৪২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

এর মধ্যে প্রায় চার হাজার কোটি ডলারের মালিক একজন। তিনি হলেন জ্যাক মা, আলিবাবা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। এর আগে অবশ্য বিশাল এই ই-কমার্স সাম্রাজ্যের প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

বিশাল এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হলেও তিনি কিন্তু খুব ভালো ছাত্র ছিলেন না। স্কুল ও কলেজে কয়েকবার ফেল করেছেন। ইংরেজিতে শিক্ষকতাও করেছেন।

তবে এসব কিছুই আলিবাবা গ্রুপ প্রতিষ্ঠার পেছনে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনি। বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের একজন তিনি।

১৯৬৪ সালে পূর্ব চীনের চচিয়াং প্রদেশের হাংচৌ শহরে জন্মগ্রহণ করেন জ্যাক মা। তিন সন্তানের দ্বিতীয় ছিলেন তিনি। তার বাবা মা-লাইফা এবং মা চুই ওয়েনচাই।

তারা ছিলেন পেশাদার গল্প বলিয়ে ও সঙ্গীত শিল্পী হলেও উপার্জন ছিলো সামান্য। ফলে সংসারে খুব বেশি স্বচ্ছলতা ছিল না তাদের। জ্যাক মা ছাড়াও তার বড় ভাই ও এক বোন ছিলো। এই সংসার থেকে উঠে এসেই আজ বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন তিনি।

ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষায় বেশ আগ্রহ ছিলো জ্যাক মা’র। উন্নতি করতে হলে এ ভাষা জানতে হবে তা তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন।

১২ বছর বয়স থেকেই ইংরেজি শেখা শুরু করেন তিনি। এজন্য ভালো একটি সুযোগও পেয়ে যান। হ্যাং-চাও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে আসা ইংরেজী-ভাষী পর্যটকদের ফ্রি গাইড হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সেখানে টানা ৯ বছর ধরে ৭০ মাইল পথ সাইকেল চালিয়ে পর্যটকদের এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতেন মা।

এর বিনিময়ে তার একটা প্রাপ্তি ছিলো ইংরেজি শিখতে পারা। তখন এক পর্যটকের সাথে তাঁর ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলে মা ইউনকে ‘জ্যাক মা’ নাম দিয়েছিলেন ইংরেজি উচ্চারণের সুবিধার্থে।

পরবর্তী জীবনে ব্যাপক সফল হলেও পড়াশুনায় তেমন ভালো ছিলেন না জ্যাক মা। প্রাইমারি স্কুলে পরীক্ষার সময় দু’বার ফেল করেন।

পরে মাধ্যমিকেও তিনবার ফেল করার পর কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিলেন। হ্যাং-চাও দিয়ানজি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগে ৩০টি চাকরির চেষ্টা করেন তিনি। তবে একটিতেও সুবিধা করতে পারেননি।

প্রাইমারিতে দুবার, মাধ্যমিকে তিনবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তিনবার ফেল করে চুড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দেন তিনি। এমনকি চীনে যখন কেএফসি আসে তখন ২৪ জন চাকরির জন্য আবেদন করে।

এর মধ্যে ২৩ জনের চাকরি হয়। শুধুমাত্র একজন বাদ পড়ে, তিনি হলেন জ্যক মা। এভাবে বারবার ব্যর্থ হয়েও পৌঁছেছেন সাফল্যের শিখরে।

রাশিয়ার লমোনোসভ মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে দেয়া এক বক্তৃতায় নিজের জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন মা।

বলেছেন, যখন তরুণ ছিলাম, বয়স কম ছিল, তখন আমি জীবনের অনেক ভুল করেছি, অনেক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমার মনে হয় জীবনে সফল হতে গেলে প্রতিটি ভুলই হয়ে ওঠে একেকটা ইতিহাস। ব্যর্থ হলে ওগুলো আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই না।

সবার জীবনেই দারুণ সব গল্প আছে, সবাই কত রকম ভুল করে, প্রতিনিয়ত অনেক অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়।

কিন্তু খুব মানুষই তাঁদের সেই ভুল, ব্যর্থতা আর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো বলতে পারে। কেউ যখন সফল হয়ে যায়, তখন তাঁর গল্পগুলো মানুষ শুনতে চায় আর অবাক হয়।

বলতে থাকে ‘তুমি তো দারুণ!’ সত্যি বলতে, আমি মোটেও দারুণ নই। আমার জন্ম একটি সাধারণ পরিবারে।

আমার পড়াশোনাও খুব বড় জায়গায় হয়নি। আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ওই বয়সে আমি সেরা স্কুলে পড়ার সুযোগ পাইনি। তাই ভালো চাকরি, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ খুঁজেও আমি ব্যর্থ হয়েছি। তবে আমি হাল ছাড়িনি।

জ্যাক মা মনে করেন, প্রত্যাখ্যানের অন্য নাম হলো সফলতা। বলেন—সবারই ব্যর্থ হওয়ার অভ্যাস থাকতে হবে। তবে ব্যর্থ হয়ে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে চলবে না। কেন আরেকজন তোমাকে সাহায্য করবে? অন্যের সাহায্য প্রার্থনা কোরো না। লোকে যেন গায়ে পড়ে তোমাকে সাহায্য করতে আসে, সেই যোগ্যতা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করো। জীবন থেকে পাওয়া আমার আরও কিছু শিক্ষা হলো— হাল ছেড়ো না।

যখন আমি ছোট, বিদ্যালয়ে বা উচ্চিবদ্যালয়ে পড়ি, তখন ভাবতাম বিল গেটসরা আমার বড় হওয়ার সুযোগটা নিয়ে নিয়েছেন। যা যা করার, যতটা সফল হওয়ার, তাঁরা সবই করে ফেলেছেন। আমার আর করার কিছু নেই।

তবে একটা সময় বুঝতে পারলাম, আমার ভাবনাগুলো অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আমাকে আগে আশপাশের মানুষদের মধ্যে থেকে তাঁদের জন্য কাজ করতে হবে। ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করতে হবে। সে সময় ভাবিনি, আজ আমি এই অবস্থানে থাকব।

১৮ বছরের চেষ্টার পর আলীবাবা আজকের এই আকারে এসেছে। এর কারণ এই নয় যে আমি বিচক্ষণ বা স্মার্ট। বরং আমি মনে করি, আমি বেশ কিছু বিচক্ষণ মানুষের সঙ্গে কাজ করি।

যাঁরা ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দেন আর নিজের ভুল ও ব্যর্থতা চাপিয়ে দেন অন্যের ঘাড়ে, তাঁরা কখনোই ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান না। কিন্তু ভুলের পর সেটা স্বীকার করে যাঁরা নিজেকে শোধরান, তাঁদের জীবনে সুযোগ আসে বারবার। তাই জীবনে ব্যর্থ হওয়া মানুষ, ভুল করা মানুষদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখি। নিজের ভুল থেকে আমি অনেক কিছু শিখি। ব্যর্থ হলে আমি নিজেকে বলি, দেখো, আমিও ব্যর্থ হই। সফল হলে বলি, ‘আমি তো ভাবিইনি এভাবে সফল হতে পারব।’

করোনায় অবদান: করোনার টিকা আবিষ্কারের গবেষণায়ও জ্যাক মা লক্ষ লক্ষ ডলার অর্থ সাহায্য করেছেন। নিজের বাড়ি চীনের যে ঝেজিয়াং প্রদেশে সেখানকার ডাক্তারদের লেখা চিকিৎসা পরামর্শের পুস্তিকা চীনা ভাষা থেকে ১৬টি বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। পৃথিবীর নানা দেশে চিকিৎসাসামগ্রী পাঠান জ্যাক মা। তিনিই একমাত্র মানুষ, চীনের হ্যাংঝু থেকে আফ্রিকার আদ্দিস আবাবায়- এক কথায় পৃথিবীর যে কোনো দেশে বিমানে করে চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ও অর্থবল যার আছে, বলেছেন মা’র জীবনীকার ডানকান ক্লার্ক।

জ্যাক মা‘রই কিছু কথা দিয়ে শেষ করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘অনেকের স্বপ্ন আছে, কিন্তু তাঁরা পরিশ্রম করেন না। অনেকে পরিশ্রম করেন, কিন্তু তাঁদের কোনো স্বপ্ন নেই। উদ্যোক্তাদের মধ্যে দুই-ই থাকা চাই। স্বপ্ন দেখতে হবে, পরিশ্রমও করতে হবে। সে সব বিশেষজ্ঞের কথা শুনবেন না, যাঁরা বলেন- এটা কোরো না, ওটা কোরো না। ভবিষ্যতে কী হতে যাচ্ছে, সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবে, পৃথিবীতে এমন কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। উদ্যোক্তারাই একদিন বিশেষজ্ঞ হবে।’

তথ্যসূত্র: বিবিসির প্রতিবেদন, উইকিপিডিয়া এবং ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন নিবন্ধ।

x