ব্রেকিংঃ পরীক্ষার বিকল্প পরীক্ষা—অটো পাস নয়

টাইমস টিভি ডেস্কঃ আমাদের প্রজাতন্ত্রে কোনো সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ভিন্নমত প্রকাশ নিরাপদ নয়। তাতে অনেকের বির’ক্তি ও বিরাগের ভাজন হওয়ার আশ’ঙ্কা ষোলো আনা।

এ বছর উচ্চ’মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা হবে না। পরীক্ষা না নেওয়ায় এবার ফেল বলে কিছু থাকছে না, প্রায় ১৪ লাখ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস। ঘোষিত হয়েছে, ‘এদের জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট) ও এসএসসির (সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট) ফলের গড় অনুযায়ী এইচএসসির ফল নির্ধারণ করা হবে।’

সরকারের উচ্চপর্যায়ের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা মন্ত্রণালয়ের কর্মক’র্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই মেরুদ’ণ্ড বা সৎ সাহস একালের কোনো কর্মক’র্তার থেকে আশা করাও অনুচিত।

নীতিনির্ধারকেরা যদি বলেন সূর্য পশ্চিম দিকে ওঠে, কার ঘাড়ে কয়টা মা’থা যে বলেন—রাত পোহালে সূর্য ওঠে পুব দিকে। সুতরাং কর্মক’র্তাদের স’ম্পর্কে বলার কিছু নেই। কিন্তু নাগরিক সমাজের অনেকের কথায় বিস্মিত হয়েছি।

তাঁরা বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত খুবই ইতিবাচক, এর কোনো বিকল্প ছিল না। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীর বিদ্যার মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষার বিকল্প শুধু পরীক্ষা, অন্য কিছু নয়।

জগতে অনেক কিছুরই গড় হয়, কিন্তু কোনো পরীক্ষার্থীর পূর্ববর্তী দুই পরীক্ষার ফলাফলের গড় দিয়ে মেধা যাচাই করা যায় না। অ’তীতে কেউ খা’রাপ করেছে বলে ভবিষ্যতে ভালো করবে না অথবা আগের দুটি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল বলে ভবিষ্যতে খা’রাপ করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বলা হচ্ছে করো’নার কারণে এই সিদ্ধান্ত। প্রথম কিছুদিন তথাকথিত লকডাউন ছিল। এখন তো সবই স্বাভাবিক। বাসের দরজায় ঝুলছে মানুষ।

লঞ্চের ছাদে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। রেলস্টেশন গিজগিজ করছে মানুষে। পোশাক কারখানায় পুরোদমে কাজ চলছে আগের মতোই। অফিস-আ’দালতে গরহাজির কেউ নেই। সংসদীয় উপনির্বাচন থেকে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনগুলো নির্বিঘ্নে হচ্ছে। হবে না শুধু এইচএসসি পরীক্ষা। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের বুদ্ধি যাঁরা সরকারকে দিয়েছেন, তাঁরা প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর শুধু নয়, সমগ্র জাতির কী’’ করলেন, তা তাঁরা জানেন না।

কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, করো’নার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া ঝুঁ’কিপূর্ণ হতো। ইচ্ছা থাকলে উপায় বের হতোই। এক বেঞ্চিতে একজন বা দুজন বসানো যেত। লম্বা সময় ধরে পরীক্ষা নেওয়া যেত। নির্দিষ্ট কেন্দ্রের চেয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আরও বেশি কেন্দ্র করা যেত।

পরীক্ষা ছাড়া অর্জিত বিদ্যার মূল্যায়ন কী’’ভাবে করা সম্ভব অনিবার্য কারণে অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে উপায় থাকে না। যেমনটি হয়েছিল ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়। ওই বছর ডিগ্রি পরীক্ষার জন্য যাঁরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি জমা দিয়েছিলেন, তাঁদের সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হতে তাঁদের সমস্যা হয়নি। তবু তাঁদের লোকে বলত ‘পার্টিশন গ্র্যাজুয়েট’। তাতে তাঁরা বিব্রত হতেন।

বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬২-এর শিক্ষানীতিবিরোধী আ’ন্দোলন এক বড় মাইলফলক। শরিফ কমিশন সুপারিশ করেছিল ডিগ্রি পাস কোর্স হবে তিন বছরের। উত্তাল ছাত্র আ’ন্দোলনের ফলে তিন বছর থেকে তা আগের মতো দুই বছরই রাখা হয়।

তখন তৃতীয় বর্ষে যাঁরা পড়ছিলেন, তাঁদের স্নাতক ডিগ্রি দেওয়া হয় পরীক্ষা ছাড়াই। তখন ছাত্রছা’ত্রীর সংখ্যা ছিল কম। এখন প্রতিযোগিতা এত কঠিন যে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হওয়া জীবন-ম’রণ সমস্যা। কুড়িজন ভর্তি পরীক্ষা দিলে সুযোগ পায় একজন। বহু মেধাবী বাদ পড়ে।

একাত্তরে বাঙালি জাতির সর্বকালের সবচেয়ে বড় বিজয় অর্জিত হয় সীমাহীন র’ক্তের বিনিময়ে। কিন্তু বাহাত্তরে আম’রা নিজেদের ক্ষতি নিজেরা করি। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে আম’রা সব ব্যাপারে স্বাধীনতা চাইলাম। পরীক্ষায় নকলের স্বাধীনতাও। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হলো বই দেখে। ’৯৭-৯৮ ভাগ প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগে পাস করল। ’৭৩-এ-ও একই অবস্থা। এর বি’রুদ্ধে চারদিকে প্রতিবাদ হতে থাকল। তারপর ’৭৪-এ ঘটল নজিরবিহীন ঘটনা। ৯৫ ভাগই ফেল। শিক্ষাজগতের এই অনাচারে বঙ্গবন্ধু ভীষণ বির’ক্ত হলেন। ২৬ মা’র্চ ১৯৭৫, রেসকোর্সের এক বিশাল জনসভায় তিনি বলেন:

‘আমি পেপারে দেখেছি যে এবারে প্রায় এক পার্সেন্ট পাস, দুই পার্সেন্ট পাস, তিন পার্সেন্ট পাস। শিক্ষক সম্প্রদায়ের কাছে আমা’র আকুল আবেদন, ফেল করাবেন না। নকল বন্ধ করেছি। আপনাদের একটা কর্তব্য আছে। বলতে পারেন, দুই পার্সেন্ট পাস করিয়ে আপনাদের কর্তব্য পালন করলেন। আমি তো শিক্ষকদের বেতন দেব, আম’রা সব আদায় করব।…আমি বুদ্ধিজীবীদের কিছু বলি না। তাঁদের সম্মান করি। শুধু এইটুকু বলি যে বুদ্ধিটা জনগণের খেদমতে ব্যয় করুন।’বিরল ব্যতিক্রম বাদে বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ স’ম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর খুব ভালো ধারণা ছিল। তবু তাঁর সময়ে বহু জ্ঞানী-গুণী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে কোনো পরাম’র্শ দিলে তিনি তাঁদের মতামতের মূল্য দিতেন।

এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য শিক্ষা বোর্ডে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ফরম পূরণ করতে হয়। এবার প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ফি বাবদ বোর্ডগুলো নিয়েছে ২০০ কোটি টাকার বেশি। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন খরচ ছাড়া অধিকাংশ টাকাই বোর্ডের ফান্ডে রয়ে গেছে। এই টাকা শিক্ষার্থীদের ফেরত দেওয়া হবে কি না, তা জানানো হয়নি। এই দুর্দিনে টাকা’টা শিক্ষার্থীদের পরিবার পেলে তাদের উপকার হবে। পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।

কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, করো’নার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া ঝুঁ’কিপূর্ণ হতো। ইচ্ছা থাকলে উপায় বের হতোই। এক বেঞ্চিতে একজন বা দুজন বসানো যেত। লম্বা সময় ধরে পরীক্ষা নেওয়া যেত। নির্দিষ্ট কেন্দ্রের চেয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আরও বেশি কেন্দ্র করা যেত। পরীক্ষা ছাড়া অর্জিত বিদ্যার মূল্যায়ন কী’’ভাবে করা সম্ভব?সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, শিক্ষা জিনিসটা বাঙালির জীবনে গুরুত্বহীন বিষয়ে পরিণত হলো। ১৪ লাখ ছাত্রছা’ত্রীর শিক্ষাজীবনের একটি অধ্যায় ফাঁকা পড়ে রইল। তবে যাদের শিক্ষাজীবন এখানেই শেষ—তেমন পরীক্ষার্থী এক-তৃতীয়াংশ হবে—তারা ছাড়া মেধাবী দুই-তৃতীয়াংশ পরীক্ষার্থীর জন্য এই অটো পাস হবে অ’ভিশাপের মতো। উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপে গিয়ে তারা পড়বে খাদের মধ্যে।

এই পরীক্ষার্থীরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তারাই ২০৪১ সালে থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, কূটনীতি প্রভৃতি জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রের ক’র্তা। তারাই কেউ হবে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত। কেমন চালাবে তারা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ? যোগ্যতার কোনো বিকল্প নেই। তাদের যোগ্যতা অর্জনের যে প্রস্তুতিপর্ব, সেটা হয়ে রইল পক্ষাঘাতগ্রস্ত।

x