শেষ দুনিয়া সম্পর্কে কিছু হাদিস

রাসূলুল্লাহ (স.)-এর পরে শেষ দুনিয়ায় যা যা ঘটবে তা তিনি সকলই বলে গিয়েছেন। মুসলমানদের সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী তা অতি সংক্ষেপে দেয়া হলো।

মুসলমান সংখ্যায় অগণিত হবে, কিন্তু প্রকৃত মুসলমানের সংখ্যা অতি নগণ্য থাকবে।

১. হাদিস: হজরত ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (স.) বলেন, মানুষ ১০০ উট সদৃশ, তার মধ্যে তুমি আরোহণ করার জন্য একটিকেও ক্বদাচিত উপযোগী পাবে না। (বোখারি)

২. হাদিস: হজরত ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (স.) বলেন, যখন আমার উম্মতগণ অহংকারের সঙ্গে চলবে এবং রাজাদের সন্তানগণ তাদের খিদমত করবে, তখন আল্লাহ সৎ লোকের ওপর অসৎ লোকদিগকে ক্ষমতা দেবেন। (তিরমিজি)

৩. হাদিস: হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (স.) বলেন, তোমাদের পূর্বে যারা ছিল, তোমরা তাদের হুবহু অনুকরণ করবে। এমনকি তাদের কেউ যদি টিকটিকির গর্তে প্রবেশ করে থাকে, তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে। প্রশ্ন করা হলো, তারা কি ইহুদি না খ্রিস্টান? তিনি বললেন, তবে আর কারা? (বোখারি, মুসলিম)

৪. হাদিস: হজরত হোজায়ফাহ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (স.) বলেছেন, পৃথিবী ধ্বংস হবে না যে পর্যন্ত তোমাদের নেতাকে তোমরা হত্যা না করবে এবং তোমাদের তরবারি দ্বারা পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ না করবে এবং তোমাদের মধ্যে অসৎ ব্যক্তিগণ দুনিয়াতে ক্ষমতা পরিচালনা না করবে। (তিরমিজি)

৫. হাদিস: হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (স.) বলেন, মানুষের ওপর এমন সময় আসবে যখন ধর্মভীরু লোক এ ব্যক্তির মতো হবে যে জ্বলন্ত অঙ্গার তার মুষ্টির ভেতর ধরে রাখে। (তিরমিজি)

৬. হাদিস: হজরত মোয়াজ বিন জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেন, শেষ সময় এমন লোক উত্থিত হবে যারা প্রকাশ্যে বন্ধু হবে, কিন্তু গোপনে শত্রু হবে। জিজ্ঞেস করা হলো: তা কি রূপে হবে? তিনি বললেন, একজন অন্যজনকে ভালোবাসা এবং একজন অন্যজনকে ঘৃণার কারণে হবে। (আবু দাউদ)

৭. হাদিস: হজরত উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, শেষ দুনিয়ায় আমার উম্মতদেরকে তাদের শাসনকর্তাগণ কষ্ট দেবে। যে আল্লাহর ধর্মকে স্বীকার করে এবং তার হাত, জিহবা এবং হৃদয়ের দ্বারা তার জন্য জেহাদ করে, এমন লোক ছাড়া অন্য কেউই সে কষ্ট হতে বাঁচতে পারবে না।

এমন ধার্মিক লোকের পুরস্কার পূর্বেই নির্ধারিত হয়েছে। আর এ লোক বাঁচবে, যে আল্লাহর ধর্ম স্বীকার করে এটা প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে এবং এ লোক যে আল্লাহর ধর্ম স্বীকার করে নীরব থাকে। সে কাউকেও সৎকার্য করতে দেখলে তাকে ভালোবাসে এবং অন্যায় কার্য করতে দেখলে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। সে সমস্ত জিনিস গোপন রাখে বলে নাজাত (মুক্তি) পাবে। (বাইহাকি)

৮. হাদিস: হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূল (স.) বলেন, সময় দীর্ঘ হলে তোমরা এমন লোক দেখবে, যাদের হাতে গরুর লেজের মতো লাঠি থাকবে। তারা আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভেতর প্রাতঃকালে ভ্রমণ করবে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভেতর তারা সন্ধ্যাকালে ফিরে আসবে। (মুসলিম)

৯. হাদিস: হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেন, যখন তোমাদের শাসনকর্তাগণ তোমাদের মধ্যে উৎকৃষ্ট লোক হবে এবং তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দানশীল হবে এবং যখন তোমাদের পরস্পরের পরামর্শ মতে কাজ হবে, তখন দুনিয়ার পৃষ্ঠ তার তলদেশ হতে তোমাদের জন্য অধিকতর উত্তম হবে। এর বিপরীত অবস্থায় দুনিয়ার পৃষ্ঠদেশ হতে তলদেশ তোমাদের জন্য উত্তম হবে। তিরমিজি)

১০. হাদিস: হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, শেষ সময় এমন লোক বের হবে যারা ধর্মের বিনিময়ে দুনিয়াকে ভালোবাসবে। তারা মেষচর্ম নির্মিত কোমল বস্ত্র পরিধান করবে। তাদের বাক্য হবে চিনি হতেও মিষ্ট, কিন্তু তাদের অন্তর হবে বাঘের অন্তরের মতো। আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি আমার সঙ্গে প্রতারণা করো, অথবা আমার বিরুদ্ধে সাহস করো? আমি আমার নামের শপথ কতেছি! আমি নিশ্চয়ই তাদের ভেতর এ লোকদের ওপর এমন বিপদ পাঠাব যা জ্ঞানীগণকেও হয়রান করবে। (তিরমিজি)

১১. হাদিস: হজরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাজিল হলো, ‘তোমার আত্মীয়গণকে সতর্ক করে দাও।’ তখন রাসূলুল্লাহ (স.) কুরাইশদের ডাকলেন। ছোট-বড় সকলেই সমবেত হলে তিনি বললেন, ‘হে বনু কায়াব! দোজখের আগুন হতে তোমাদের বাঁচাও; হে বনু আবৃদ মোনাফ! দোজখের আগুন হতে তোমাদের বাঁচাও! এভাবে হে বনু হাশেম, হে বনু আবদুল মোত্তালিব! দোজখের আগুন হতে তোমাদের বাঁচাও। আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের জন্য আমার কোনো কর্তৃত্ব নেই।

তোমাদের সঙ্গে আমার কেবল রক্তের সম্পর্ক আছে। তা আমি তাজার ন্যায় তাজা রাখব। অন্য বর্ণনায়, হে সমবেত কুরাইশগণ! তোমরা তোমাদের জন্য বেহেশত ক্রয় করো। তোমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে আমার কোনোই কর্তৃত্ব নেই। হে বনু আবদ্ মোনাফ, হে আব্বাস, হে সুফিয়ান, হে ফাতিমা! আমার সম্পত্তি হতে যত ইচ্ছা তত আমার কাছে চাও, কিন্তু তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে আমার কোনোই কর্তৃত্ব নেই।’ (বোখারি, মুসলিম)

১২. হাদিস: হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো, তোমার কাছে-আত্মীয়গণকে সতর্ক করে দাও।’ তখন রাসূলুল্লাহ (স.) সাফা উপত্যকায় উঠে ঘোষণা করতে লাগলেন, হে ফিহির, হে কুরাইশগণের বংশধর, হে বনু আদী! তারা সকলেই সমবেত হলে তিনি বললেন, আমি যদি তোমাদের এ সংবাদ দেই যে, একদল অশ্বারোহী সৈন্য তোমাদের আক্রমণ করার জন্য এ উপত্যকার পেছনে আছে, তোমরা কি সত্য বলে বিশ্বাস করবে? সকলে বলল, হ্যাঁ, কেননা অভিজ্ঞতার দরুন তোমাকে সত্যবাদী ও বিশ্বাসী বলেই জানি।

তিনি বললেন, তা হলে আমি তোমাদের ভীষণ শাস্তির আগমনের বিষয় সতর্ক করে দিতেছি। আবু লাহাব বলে উঠল, তোমার হস্ত ধ্বংস হোক। অন্য বর্ণনায়, তিনি ঘোষণা করলেন, হে আবদ মোনাফের সন্তানগণ! নিশ্চয় আমার এবং তোমাদের তুলনা এ ব্যক্তির ন্যায়, যে শত্রুকে দেখে তার পরিবারগণকে পূর্বে সতর্ক করতে যায়। তারা পূর্বে তাদের কাছে যেতে পারে বলে সে ভয় করে। তারপর সে চিৎকার করে, হে সাথিগণ, হায় আফসোস! (বোখারি, মুসলিম)।

১৩. হাদিস: হজরত আবু আমের (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক হবে, যারা রেশমি বস্ত্র, মদ এবং সংগীত-যন্ত্রাদি হালাল মনে করবে। আর পাহাড়ের নিকটস্থ এলাকায় এমন লোক হবে যাদের কাছে প্রাণীসকল প্রাতে চলে আসবে এবং তাদের একজন লোক তাদের কাছে ভিক্ষা চাইলে বলবে, কাল আসিও। আল্লাহ তাদের ওপর দিয়ে রাত্রিটি অতিবাহিত করাবেন এবং উপত্যকাটি উল্টাইয়ে দেবেন এবং যারা বাকি থাকবে। তাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত বানর এবং শূকরে পরিণত করে রাখবেন। (বোখারি)

১৪. হাদিস: হজরত আবু মুসা (রা.) হতে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেছেন, আমার এই উম্মতগণকে দয়া করা হয়েছে আখিরাতে তাদের শাস্তি হবে না। তাদের শাস্তি এ দুনিয়াতেই হবে-বিপদ-আপদ, অশান্তি এবং হত্যা দ্বারা। (আবু দাউদ)

১৫. হাদিস: হজরত ইয়াজ বিন হোমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (স.) একদিন খুতবায় বললেন, ‘সতর্ক হও! আমার প্রভু আজ যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা তোমরা জান না; তোমাদের শিক্ষা দিতে আদেশ দিয়েছেন। যে সম্পত্তি আমি আমার বান্দাকে দিয়েছি তা হালাল। আমি প্রত্যেক বান্দাকে ধর্মপ্রবণ করেছি, কিন্তু শয়তান এসে ধর্ম হতে অন্য পথে নিয়ে যায় এবং আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছি, তা হারাম করে। শয়তান তাদের আমার শরিক করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু আমি তাদেরকে এ বিষয়ে কোনো ক্ষমতা দেই নাই।

আল্লাহ পৃথিবীর বাসিন্দাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। সকলকেই পথভ্রান্ত দেখলেন এবং আরব ও আজম (বিদেশি) উভয়ের অধিবাসীদের তাঁর ক্রোধের অধীন রেখে। শুধু কিতাবপ্রাপ্ত লোকদের বাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি তোমাকে এবং তোমার মারফতে অন্যান্যকে পরীক্ষা করার জন্য তোমাকে পাঠিয়েছে এবং আমি তোমার ওপর এমন কোরআন অবতীর্ণ করেছি যা পানিতে নষ্ট করবে না, হয় তুমি নিদ্রিত বা জাগ্রত হয়ে এটা পাঠ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে কুরাইশদের ধ্বংস করার জন্য আদেশ দিয়েছিলেন।

আমি বললাম, তা হলে তারা আমার মস্তক বিদ্ধ করবে এবং রুটির মতো একে পিষবে। তিনি বললেন, ‘তারা তোমাকে যেরূপ তাড়িয়ে দিয়েছে, তদ্রূপ তুমিও তাদেরকে তাড়াও এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো। আমি তোমাকে অস্ত্র-শস্ত্র দেব। ব্যয় করো, তা হলে তোমার জন্য ব্যয় করা হবে। সৈন্য প্রেরণ করো, তা হলে আমরা তার পাঁচগুণ সৈন্য প্রেরণ করব। যারা তোমাকে মানে, তাদের সাহায্যে যারা তোমাকে মানে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো।’ (মুসলিম)

x